
রবি আড্ডায় শৌভিক রায়
পর্ব – ১১
পাস সাবজেক্টের পরীক্ষাগুলি আগে হয়ে গেল। সেই কবে, কলেজ জীবনের একদম শুরুতে, বিগত বছরগুলির প্রশ্ন ঘেঁটে, নিজের মতো সাজেশন বানিয়ে, নোটস তৈরি করেছিলাম। সেগুলিই এলো। সমস্যা হল না কোনও।
ঝামেলা হল অনার্স পেপারে এসে। ফার্স্ট পেপারে ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাস। প্রশ্ন পেয়ে দেখি সেই অর্থে একটিও কমন নেই। কী করব বুঝতে পারছি না। ভাবলাম খাতা জমা দিয়ে হল থেকে বেরিয়ে যাই। পরক্ষণেই মনে হল, অনার্স তো পাচ্ছিই না। একদম নিশ্চিন্ত। বেরিয়ে আর কোথায় যাব! তার চাইতে নিজের মতো লিখি। যা মনে আসে।
মিনিট কুড়ি-পঁচিশেক এসব ভাবতেই গেল। শুরু করলাম নিজের মতো। প্রিয় কবি টি এস এলিয়টকে নিয়ে প্রশ্ন এসেছে। ডিসি স্যারের কাছে যা জেনেছি সবটা লিখলাম। অনিলকাকুর নানা কথা মনে পড়ল ওল্ড ইংলিশ আর রোমান্টিক পিরিয়ডের প্রশ্নে। লিখতে থাকলাম। এক সময় দেখি ডিসি আমার পেছনে দাঁড়িয়ে খাতা দেখছেন। কিছু বললেন না। চুপচাপ চলে গেলেন।
ফেল করছি, এই ভাবনা নিয়ে পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরলাম। সেকেন্ড পেপার অর্থাৎ কবিতার ক্ষেত্রেও একই হল। আবার সেই নিজের মতো লেখা। যা জানি। বা বলা ভাল, যতটুকু বুঝেছি। থার্ড পেপার নাটক। আগের দুই পেপারের চাইতে ভাল হয়েছে বলে আমার মনে হল। তবে নিশ্চিন্ত অনার্স টিকবে না।
পরীক্ষা শেষে চলে এলাম ফালাকাটায়। এমনিতে সবসময়ই ফালাকাটার সঙ্গে যোগাযোগ। আমি, পুটন, প্রণব, বাপি ফালাকাটায় চারমূর্তি নামে পরিচিত। প্রণব জলপাইগুড়ি এ সি কলেজে পড়ছে। বাপি আর পুটন ফালাকাটা কলেজে। চারজন একসঙ্গে হলেই হৈ হৈ আড্ডা চলে। বাকিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে। ঋত্বিক আলিপুরদুয়ারে। শৈবাল শিলিগুড়িতে। কমল অবশ্য ফালাকাটাতেই আছে। পূর্ণ, কিছুদিন আগেও, দিনহাটায় চিঠি পাঠিয়ে, আমাকে ডেকে আনত ওদের পাড়ার হয়ে ক্রিকেট খেলার জন্য। ও-ও আছে। .তবে খুব দ্রুত সীমান্তরক্ষী হিসেবে চাকরিতে চলে যাবে।
আপাতত পড়া-টড়া নেই। অতএব পুটন আর আমি চললাম বানারহাটে। পুটনের পিসির বাড়িতে। চা-বাগান ঘেরা বানারহাট চিরকালের প্রিয় জায়গা। ওখানে পুটনের পিসতুতো ভাই বাবুর সুবাদে পরিচয় হল রাহুলের সঙ্গে। রাহুল এ সি কলেজে ইংরেজি অনার্স পড়ছে। আমাদেরই ব্যাচ। সারারাত পিসির বাড়ির টিনের চলে বৃষ্টির শব্দ শুনে, পরদিন জলপাইগুড়ি। বড় কাকিমার বাপের বাড়ি। পাণ্ডা পাড়ায়। নিউ সার্কুলার রোডে সেজ কাকিমার বাপের বাড়িও যাওয়া হল। এভাবেই উল্টোপাল্টা ঘুরতে ঘুরতে মনে হল এবার কী? পার্ট টু তো আছে। পড়া কি শুরু করব, নাকি রেজাল্টের অপেক্ষায় থাকব?
সাহস করে পোস্টকার্ড লিখলাম রীনাকে। কী করছে জানবার জন্য। ভাবিনি উত্তর আসবে। কিন্তু আমাকে অবাক করে উত্তর এলো। ওর চিঠিতেই জানলাম, অনিলকাকু হয়ত আর পড়াবেন না। তাই ও কোচবিহারে মৌলিকবাবুর কাছে পড়তে শুরু করেছে।
টনক নড়ল আমার। ভাবলাম আমাকে নিশ্চয়ই কাকু পড়াবেন! যদিও নিজেই জানিনা অনার্স পাব কিনা। তবু অন্তত খোঁজ নেওয়া দরকার। যদি অনার্স পাই, তবে? এলাম কোচবিহারে। গৌরী মহলের পেছনের সেই বাড়ি ছেড়ে কাকুরা এখন গোলবাগানের কাছে, সুনীতি একাডেমির পাশে, একটা বাড়িতে এসেছেন। কাকু জানালেন, এম ফিল করতে যাচ্ছেন। তাই ওঁর পক্ষে পড়ানো সম্ভব নয়। সাজেস্ট করলেন, আমি যেন অম্লানজ্যোতি স্যারের (এ জে এম) কাছে যাই। আমি যেরকম ভাবে পড়তে ভালবাসি, তাতে উনি আদর্শ হবেন।
কাকুর বাড়ি থেকে যখন বেরোচ্ছি, তখন আমার জুতোর ফিতে বাঁধা দেখে কাকু হেসে কুটোপাটি। সত্যিই জুতোর ফিতে ঠিকঠাক বাঁধতে পারতাম না। কাকু নিজে বসে পড়লেন ফিতে বেঁধে দিতে। হাজারও বাধাতেও থামলেন না। এক রাশ ভাল লাগা নিয়ে চললাম এ জে এম-এর বাড়ি।

বাড়ির নাম রাজনগর। কাঠ আর কাঁচের সুদৃশ্য বাড়ি। এই বাড়ি থেকে কয়েক বছর আগে রিপ্লাই পোস্টকার্ডে চিঠি গেছে ফালাকাটায়। লিখেছেন একমেবাদ্বিতীয়ম অমিয়ভূষণ মজুমদার। আমাদের পত্রিকা মুজনাইয়ের জন্য ওঁর শুভেচ্ছা বার্তা চেয়েছিলাম। নিরাশ করেননি। উত্তর দিয়েছিলেন। ওই পোস্টকার্ডে তিনি লিখেছেন এক অমোঘ সত্য- প্রত্যেকটা মানুষ-জীবন একটা কাব্য। লিখে ফেলতে পারলেই তা সুন্দর। গেট খুলে সামনে এগিয়েই দেখি ইজিচেয়ারে উনি আধা শোওয়া হয়ে আছেন। ওঁর চরণ স্পর্শ করে এ জে এম স্যারের খোঁজ করলাম।
এ জে এম স্যার সম্পর্কে বহু কিছু শুনেছি। একটু ভয় ভয় লাগছে। দেখি পড়ার ঘরে আমার চার সহপাঠী পড়ছে। পড়ার কথা বললাম। জানতে চাইলেন, আগে কোথায় পড়তাম। অনিলকাকুর কথা শুনে, চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, আমি তাহলে তোমার সেকেন্ড চয়েজ। উনি পড়াচ্ছেন না, বলে আমার কাছে এসেছ। কিন্তু আমার ব্যাচ ফুল। তোমার কলেজের যারা পড়ছে তারা সব্বাই অনার্স পাবে। তোমার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, তুমি পাবে না। যদি পাও, তখন খোঁজ কর। যদি ব্যাচ ফাঁকা থাকে, তবে দেখা যাবে। এখন হবে না। চলে যাও।`
এভাবে এ জে এম স্যার ফিরিয়ে দেবেন কল্পনাতেও আসেনি। একটু আগে কাকুর জুতোর ফিতে বেঁধে দেওয়ার আনন্দে আকাশে ভাসছিলাম। দুম করে পড়লাম শক্ত মাটিতে। মন খুব খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু কিছু করার নেই। চললাম দিনহাটায়। আমার অবস্থা দেখে ভজন কী বুঝল কে জানে। বলল,
- চল ঘুরে আসি।
- কোথায়?
- বাইরে।
- বাইরে বলতে?
- তুই ঠিক কর। তুই তো ঘুরিস।
- কিন্তু কোথায়?
- দার্জিলিং দেখি নাই। দেখাবি?
- দার্জিলিং? কিন্তু পয়সা?
- দাদার কাছ থেকে নিয়ে নেব। চল
- নিবি? তাহলে চল।
জীবনদা ৩০০ টাকা দিল। দুপুরে রওনা দিয়ে, জলপাইগুড়িতে এক রাত থেকে, পরদিন পৌঁছে গেলাম দার্জিলিংয়ে। চকবাজারের কাছে সস্তার হোটেল পেলাম। দার্জিলিং বহুবার গিয়েছি। মোটামুটি সব চিনি। ভজনের গাইড হয়ে সারাদিন দার্জিলিং চষে বেড়াই। রাতের বেলায় চকবাজারের সমতল অংশে মিটিং শুনি। মশাল জ্বালিয়ে জ্বালাময়ী ভাষণ দেন নেতারা। চাপা অসন্তোষ ধরা পড়ে সেই মিটিংয়ে। পাহাড় যে অশান্ত হয়ে আছে বুঝি। যদিও আমার আর ভজনের মতো কমবয়সী দুই টুরিস্টকে পাহাড়ের সরল মানুষেরা রাস্তা চিনিয়ে দিতে বা সস্তার খাবার হোটেলের খোঁজ দিতে আন্তরিকভাবেই সাহায্য করেন।
দার্জিলিং থেকে ফিরতে ফিরতে ঠিক করলাম, রেজাল্ট না বেরোনো পর্যন্ত পড়ার ব্যাপারে আর কোনও খোঁজ করব না। যা হওয়ার হবে। এমনিতেই অনার্স পাব না। তাই শুধু শুধু ভেবে লাভ কী!
(ক্রমশ)
পর্ব- ১০
https://www.facebook.com/share/p/1MS7B5omjR/