রবি আড্ডায় শৌভিক রায়

পর্ব – ৯

সেকেন্ড ইয়ারে কলেজে এলেন ইংরেজির অধ্যাপক দেবাশিস চট্টোপাধ্যায়।

সুশান্তবাবু বা এস সি গবেষণার কাজে ব্যস্ত বলে, খুব বেশিদিন ক্লাস করাতে পারেননি। সম্ভবত এই সময়টাতেই কর্মরত কলেজ-শিক্ষকদের গবেষণা এবং এম ফিল করা বাধ্যতামূলক হয়েছিল। সুশান্তবাবু আগে থেকেই কাজ করছিলেন। তিনি ফিরলেই অনিলকাকু এম ফিল করতে যাবেন, সেটা বুঝতে পারছিলাম। এস সি না থাকায়, খুব স্বাভাবিকভাবেই কাকুর একার ওপর ক্লাসের চাপ বাড়ছিল। আমাদের আগে একটি ব্যাচ। পরে আর একটি। একটি মানুষের পক্ষে সব ব্যাচ সামলানো যথেষ্ট কঠিন। ফলে দেবাশিসবাবুর কলেজে আসাটা নিঃসন্দেহে অন্য ব্যাপার হল।

দেবাশিসবাবুর বা ডিসি স্যারের গায়ে রীতিমতো ছাত্র ছাত্র গন্ধ। হিসেবে করে দেখলাম আমাদের চাইতে উনি, খুব জোর হলে, বছর পাঁচ-ছয়েকের বড়। ঝকঝকে মানুষ। পড়ান ভাল। বাড়ি ভাড়া করেছেন মদনমোহন বাড়ি পাড়ায় মৌসুমীদের বাড়ির কাছে। ওই বাড়ির কাছেই দিনহাটার বিখ্যাত হোমিওপ্যাথ ডাক্তার মানিক সোমের বাড়ি। ওঁর চেম্বার আবার আমাদের বাড়ির উল্টোদিকেই, গোধূলি বাজারে।

অনিলকাকু যদি হন ইংরেজি সাহিত্যে রোমান্টিক ও ভিকটোরিয়ান পিরিয়ডের মাস্টার-ব্লাস্টার, তবে ডিসি ছিলেন মডার্ন পিরিয়ডের সুপার জিনিয়াস। বার্নার্ড শ-এর Arms and the Man এত সুন্দর পড়ালেন যে বলার নয়! আধুনিক যুগের মহাকাব্য The Wasteland এবং টি এস এলিয়ট নিয়ে ওঁর ব্যাখ্যা আমাকে এমন মুগ্ধ করল, এলিয়টকে নিয়ে নিজের মতো পড়াশোনা শুরু করলাম। সত্যি বলতে, ডিসি আমার সামনে ইংরেজি সাহিত্যের একবারে অন্যদিকে খুলে দিলেন। এতদিন সেই দিকটি কিছুটা ঝাপসা ছিল। ওঁর সঙ্গে আমার বেশ ভাবও হয়ে গেল। পৌষ সংক্রান্তিতে ওঁর বাড়িতে পিঠে নিয়ে হাজির হলাম। তৃপ্তি করে খেলেন। কিছুদিন পর ওই পাড়া ছেড়ে চলে এলেন বোর্ডিং পাড়ায় রাজেন চ্যাটার্জির বাড়িতে।

স্যারের কাছে শুনেছিলাম, কলেজ সার্ভিস কমিশনের ইন্টারভিউতে ওঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, চাকরির জন্য উনি কি বাংলাদেশ লাগোয়া উত্তরবঙ্গে যেতে রাজি? উত্তরে স্যার জানিয়েছিলেন, প্রয়োজনে ভারতের যে কোনও প্রান্তে যেতে ওঁর কোনও আপত্তি নেই। রোম্যান্টিকতা বর্জিত অত্যন্ত বাস্তববাদী মানুষটিকে ভাল লেগে গেল সবারই। বোর্ডিং পাড়া আমাদের দিনহাটার বাড়ি থেকে খুব একটা দূরে নয়। আজকাল ওই পাড়ার কাছেই সকালে একটি বাজার বসছে। কিছুদিন আগেও সামান্য কয়েকটি দোকান ছিল। ধীরে ধীরে পসার জমছে। লোকমুখে তার নাম হয়েছে আলসে বাজার। ঘুম থেকে দেরি করে উঠে অলস লোকেরা সেখানে নাকি বাজার করে। তাই এই নাম। পশ্চিমবঙ্গের আর কোথাও এরকম নাম আছে কিনা জানা নেই।

এখন, এই কলেজ জীবনে, বোর্ডিং পাড়া তবু কিছুটা বড় বলে মনে হয়। কিন্তু একটা সময় দিনহাটা গার্লস হাই স্কুল আর রাজকুমার প্রাইমারি স্কুলের পেছনে কয়েকটা বাড়ি আর দুই-চারটে চাপা রাস্তা নিয়েই ছিল পাড়াটি। এখনও অবশ্য সেই মাঠটি আছে, যেখানে পুজো হয়। মাঠের দক্ষিণ দিকে একটি বাড়ি। মানিক দত্তের বাড়ি বলেই সেটা পরিচিত। ওই বাড়ির পরে লম্বাটে একটা পুকুর। ছোটবেলায় ওই পুকুরটাকে খুব ভয় পেতাম। ওখানে নাকি চন্দ্রবোড়া সাপ আছে। যখন দিনহাটা গোপালনগর শরণার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ছি, ক্লাস ওয়ান/টু-তে, তখন বোর্ডিং পাড়ার এখন থেকেই আমাকে পড়াতে যেতেন এক দিদিমণি। সম্ভবত শর্মিষ্ঠা ছিল তার নাম। এখন আর সেই দিদিমণিকে খুঁজে পাই না। হয়ত দিনহাটা ছেড়ে চলে গেছেন। বোর্ডিং পাড়া থেকেই একটা রাস্তা চলে গেছে দিনহাটা কৃষি মেলার দিকে। শোনা যাচ্ছে, বাস স্ট্যান্ডটিকে ওদিকে নিয়ে যাওয়া হবে। ফুলদিঘির কাছে প্রতিদিন জ্যামজট মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

কলেজে আমাদের পরের ব্যাচ চলে এসেছে। কোচবিহার থেকে অনেকে ভর্তি হয়েছে। মাত্র তিন বছরে দিনহাটা কলেজের ইংরেজি অনার্স এভাবে পরিচিতি পেয়ে যাবে, ভাবিনি কখনও। এমনিতে দিনহাটার কমার্স স্ট্রিম নাম করা। বাইরে থেকে প্রচুর ছেলেমেয়ে কমার্স পড়তে আসে। এবার যেমন ফালাকাটা থেকে এসেছে কল্যাণ চন্দ। কল্যাণ আমার ছোট ভাই। ফালাকাটায় আমরা একসঙ্গে বড় হয়েছি। ওর বাবা কানুস্যার আমাদের শিক্ষক ও ফালাকাটার অত্যন্ত নামকরা মানুষ। নিশ্চিন্ত ছিলাম, কল্যাণ অত্যন্ত ভাল রেজাল্ট করবে।

এমনিতেই বিরাট এলাকা জুড়ে শুধুমাত্র এই একটিই কলেজ। প্রচুর ছাত্র সংখ্যা। কিন্তু এবার জেলা সদর ও অন্য জেলা থেকেও ছাত্র আসতে শুরু করায়, কলেজের সুনাম যে বাড়ছে সেটা বুঝতে পারছিলাম। ইংরেজি অনার্স আমাদের আগের ব্যাচে রয়েছে অমিত কুমার দে। অমিতদাকে আগে থেকেই চিনি। দীর্ঘদিন ধরে নবপল্লব নামে পত্রিকা সম্পাদনা করে। ফালাকাটায় আমরা প্রকাশ করতাম মুজনাই। তখন থেকেই ওর সঙ্গে পরিচয়। ওর বন্ধু প্রদোষ রঞ্জন সাহাকেও জানি। সম্পাদনায় যুক্ত। দিনহাটার বিখ্যাত প্রগতি চা ভান্ডার ওদেরই। ওই দোকানের পাশেই সারা ভারত ফরওয়ার্ড ব্লকের হেড অফিস। সেখানেই মাঝেমাঝে দেখি মন্ত্রী শ্রদ্ধেয় কমল গুহ, বিধায়ক শ্রদ্ধেয় দীপক সেনগুপ্ত প্রমুখদের। সেনগুপ্ত বাড়িও অফিসের মোটামুটি উল্টোদিকে। বাড়ির সামনে একটি স্টেশনারি দোকান আছে। অন্য কারও হয়ত। নামটি অদ্ভুত- টিট বিট। শ্রদ্ধেয় দীপক সেনগুপ্তর ছেলে দীপ্তিমান, ভজনের সহপাঠী। মাঝে মাঝে গোধূলি বাজারে আসে খেলতে বা আড্ডা দিতে। ও আমাকে না চিনলেও, আমি ওকে চিনি।

ছবি- কোচবিহার ক্যান্সার সেন্টারের জন্য ফালাকাটায় অর্থ সংগ্রহে ভাষণরত ও পরবর্তীতে তখনকার ছাত্রদের সঙ্গে শ্রদ্ধেয় কমল গুহ

দিনহাটার কমল গুহ ও দীপক সেনগুপ্তর জুড়ি সারা রাজ্যেই নামকরা। বলা ভাল, রাজ্য রাজনীতির অন্যতম চর্চার বিষয় তাঁরা। প্রথমবার মন্ত্রী হয়ে যখন কমল গুহ কলকাতায় রাজভবনের কোয়ার্টার্সে, তখন একবার তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলাম। বেলামসি, অর্থাৎ কমল গুহের সহধর্মিণী, দিনহাটা গার্লস হাই স্কুলে মায়ের সহকর্মী ছিলেন। সেই সুবাদেই যাওয়া। এমনিতে বেলামাসি ও ওঁর বড় মেয়ে ইন্দ্রাণীদির সঙ্গে আমার নিজের খুব ভাব থাকলেও, কমল গুহর মতো ব্যস্ত জননেতাকে দূর থেকেই চিনি। যদিও বাবার সঙ্গে তাঁর বেশ ভালই যোগাযোগ। ফালাকাটায় ১৯৮১ সালে কলেজ স্থাপনে কমল গুহর যে যথেষ্ট অবদান ছিল, সেটা মনে আছে। কিন্তু দীপক সেনগুপ্তর সঙ্গে একদিন অদ্ভুতভাবে কথা হল। কোচবিহার মিনি বাস স্ট্যান্ড থেকে যে বাসে উঠেছি, সেই একই বাসে সওয়ার তিনিও। নিজে থেকেই কথা বললেন। দিনহাটায় কোথায় বাড়ি শুনেই বললেন, তুমি নীরদবাবুর ছোট ছেলে! এরপর পুরো রাস্তা তাঁর কথা শুনে কেটে গেল। নানা গল্প। রাজনীতি থেকে পারিবারিক কথা পর্যন্ত। জানতাম মানুষটি তাত্ত্বিক নেতা। কিন্তু তত্ত্বের নিরস বস্তুও যে এতটা মনোগ্রাহী হয়ে উঠতে পারে, সেটা তাঁর কথা শুনেই বুঝলাম।

এই বাড়ির আর একজন, কালু সেনগুপ্তকেও (ভাল নাম জানি না) সবাই চেনেন। ওঁর মানসিক কিছু সমস্যা আছে। ধপধপে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরে মানুষটি বিকেলবেলায় কোনও দিন চৌপথীর দিকে, কোনও দিন হলের মাঠের দিকে ঘুরে বেড়ান। নিজের মনে কথা বলেন। কখনও কোনও পথচারীর ব্যবহার পছন্দ না হলে, বকুনি দেন। মহিলারা তাঁকে দেখলেই ভয়ে অন্য পথে পালান। কেন যেন উনি ভজনকে পছন্দ করেন। ভজনের কাছেই জেনেছি, অত্যন্ত পণ্ডিত মানুষটি। দীপ্তিমানের সঙ্গে বন্ধুত্বের সুবাদে, ভজনের ওই বাড়িতে অবাধ যাতায়াত।

এর মধ্যে রীনা আবার খেপেছে আমার ওপর। টাইপ কিছুটা শিখে রীনা, স্বাতী আর পাঞ্চালির জন্য নেম-স্টিকার তৈরি করেছিলাম। রীনার জন্য পাঁচটি, ওদের দুজনের জন্য দশটি করে। এটাই ওর পছন্দ হয়নি। কেন ওদের দশ, আর ওর জন্য পাঁচ! পরদিন আরও পাঁচটি করে নিয়ে গেলাম। প্রথমে নিল না। পরে নিয়ে ফেলে দিল। স্বাতী যত বোঝায়, তত রেগে ওঠে। আমার আর কী! ওর পাগলামিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। কিছুদিন আগে, মানি আর আমি দিনহাটা ফিরছিলাম বাসে। খুব গরমে আমার শরীর খারাপ লাগছিল। দেওয়ানহাটে নেমে পড়তে বাধ্য হয়েছি। ওদের বাড়িতে কিছুক্ষণ থেকেছি।

রীনা বাড়িতেই ছিল। আগে আর একবার অনিলকাকুর সঙ্গে গিয়েছিলাম। সেদিন বাড়ির উল্টোদিকের মাঠে ছেলেদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলছিল। কোনও মেয়ে যে এভাবে ছেলেদের ওপর হম্বিতম্বি করে সবার আগে ব্যাট আর বল করতে পারে, সেটা ওকে না দেখলে বুঝতাম না।

(ক্রমশ)

পর্ব-৮

https://www.facebook.com/share/p/1ZvpbJDBUr/a

By nb24x7

দিনদুনিয়ার খাসখবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *