
রবি আড্ডায় শৌভিক রায়
পর্ব – ১৫
আবছায়া অন্ধকার। গাছের ডালগুলো নেমে এসেছে প্রায় রাস্তায়। খুনিয়া মোড় থেকে ডাইনে বাঁক নিতেই পাহাড়ের আভাস।
পাহাড় আর অরণ্য। দুর্দান্ত কম্বিনেশন। নীল পাহাড়ের গায়ে সাদা মেঘ আর চারপাশে সবুজ জঙ্গল। হৈ হৈ করে উঠল সবাই। বিরক্ত হলাম। অরণ্যের নির্জনতাকে ভাঙবার পক্ষপাতী নই কখনও। উঠে দাঁড়িয়ে একটু বকুনিই দিলাম সবাইকে। কিন্তু রীনা ভেংচে উঠল। কথা শুনবে না। ওরকমই করবে। সবাইকে নিয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে শুরু করল গান- ফেটে গেল ফেটে গেল কালীরামের ঢোল।
মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। এমনিতেই বসে আছি বাসের পাদানিতে। কখনও ইঞ্জিনের কাছে যেতে হচ্ছে। সাধনদা ডাকছে। বৈরাগীদা নিজে বসে আছে লাস্ট সিটে। আজ বাসের ক্লিনার-হ্যান্ডিম্যান আমিই। আর আমার সঙ্গে সঙ্গত করছে মধু।
রীনাকে যখন দেওয়ানহাট থেকে তুলছি, তখন ওর মেজদার কথা ভাল লাগেনি। শুনেছি এই দাদা ইউনিভার্সিটিতে অংক নিয়ে পড়ছে। বোনকে যেন ভালভাবে ফিরিয়ে আনা হয়, সেই ব্যাপারে জ্ঞান দিয়েছে আমাদের। সঙ্গে স্যারেরা যাচ্ছেন, অন্য অনেক মেয়েও আছে। তবু এত চিন্তা কেন কে জানে!
সিটে আমাদের জায়গা হয়নি। যে যার মতো বসে পড়েছে। তাতে অবশ্য অসুবিধে নেই। আমি আর মধু দিব্যি বসে আছি পাদানির ওপর। কখনও বাইরে দেখতে ইচ্ছে হলে, উঠে দাঁড়াচ্ছি। সোনাপুর থেকে ফালাকাটা অবধি ধুলো রাস্তা। শিলতোর্ষা আর বুড়িতোর্ষায় কাঠের ব্রিজ। ল্যাগব্যাগ করে। রাস্তায় বিরাট পাথর একটা। গাড়ি এগোতে পারে না। নেমে দুই হাতে পাথর সরাই। আলি স্যার বলে ওঠেন, তোমার তো দেখি বেশ ইয়ে আছে....পাথরটা তুলে ফেললে!
আসলে পাথর তো আমি তুলিনি। আমাকে দিয়ে তুলিয়েছে। সকাল থেকেই নিজেদের মতো রয়েছি মধু আর আমি। কিন্তু রীনার তাকানো দেখে মনে হচ্ছে, ও কিছু আঁচ করেছে। মুখে যদিও বলছে না। ভাবভঙ্গিতে বুঝিয়ে দিচ্ছে সেটা। এই গান তারই প্রকাশ।
জলঢাকায় অনেকটা সময় কেটে গেল জায়গা বাছতে। আরও কিছু পিকনিকের দল আছে। তবে মোটামুটি ফাঁকাই। টিফিন নিয়েই যে যার মতো ভ্যানিশ হয়ে গেল। লক্ষ্য করলাম একদল ছেলে-মেয়ের সঙ্গে রীনাও চলে গেল। ওরা নাকি পাহাড়ে উঠবে। নদীতে জল কম। পাথরের ওপর পা দিয়ে এপার-ওপার করা যায়।
মধু আর আমি কাঠ জ্বালিয়ে শুরু করলাম রান্না। এই ব্যাপারে কোনও অভিজ্ঞতা নেই। মধু যা বলে, সেটাই করি। আমাদের কাণ্ড দেখে সাধনদা আর বৈরাগীদা হেসেই মরে! শেষটায় ওরাও যোগ দিল আমাদের সঙ্গে। ঝটপট এগোতে লাগল রান্না। একটু খারাপ লাগছিল, কিচ্ছু দেখতে পারলাম না বলে। অবশ্য এইসব এলাকা আমার বহুবার ঘোরা। মধুই বরং প্রথম এলো। তাই ঠেলে গুঁতিয়ে ওকে পাঠিয়ে দিলাম ঘুরতে। বাকি যা ছিল রান্নার, তার সবটা উঠে গেল সাধনদাদের জন্য।
একজন দুজন করে ফিরে আসছে সবাই। দেখেই বোঝা যাচ্ছে যথেষ্ট ক্লান্ত। আসলে পাকদন্ডী রাস্তায় অভ্যেস না থাকলে বেশিক্ষণ এনার্জি ধরে রাখা যায় না। রীনাদের দলটাও ফিরে এলো। কোথায় গিয়েছিল কে জানে। তবে রীনাকে দেখলাম বেশ গম্ভীর হয়ে আছে। তেমন কথা বলছে না কারও সঙ্গেই।
নদীর ধরে গোল করে বসে খাওয়া শুরু হল। একদম শেষে মধু আর আমি। চুপচাপ দেখলাম, আমাদের খাবার থালা রীনা রেডি করল।
সব সেরে ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধে । শীতের বেলা। ঝপ করে অন্ধকার নেমে আসে। স্যারেরাও আর থাকতে চাইছেন না। বেশ স্পিডে বাস চালিয়ে ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই ফালাকাটায় চলে এলাম। বাড়ির সামনে দিয়ে সকালে গেছি, স্যারদের বললাম পাঁচ মিনিটের জন্য ঢুকতে। কেউ না করলেন না। ছেলেমেয়েরাও সব্বাই নেমে পড়ল আমার বাড়ি দেখতে। রীনাও নেমেছে। কোন ফাঁকে রান্নাঘরে মায়ের কাছে চলে গিয়ে গল্পও করে এসেছে। পাঁচ মিনিট আধাঘন্টা হয়ে গেল। কোচবিহারের লোকেদের নামিয়ে দেওয়ানহাটে যখন রীনাকে নামাচ্ছি, মনে হল ওর দাদাকে বলে যাই বোনকে বুঝে নিতে। কিন্তু সেটা আর হল না।

পেছনে দাঁড়িয়ে বাঁ দিকে দাদা, ডাইনে আমি
বসে- বাঁ দিক থেকে বোন অ্যানি, ঝিনি, রিনি
নিচে- ঝিনির সামনে ভাই
আমাদের যৌথ পরিবারে আলাদা কোনও ভাগ ছিল না। আমরা খুড়তুতো-জ্যাঠতুতো ভাইবোন কখনও নিজেদের আলাদা ভাবিনি। এই ছবিতে আরও দুই বোন নেই।
দুদিন পর পরের ব্যাচের কাকলি, পপি, সোমা সব ছেঁকে ধরল,
- ও শুভদা….রীনাদি তো সেই বলছে!
- মানে?
- তোমাদের বাড়ি খুব পছন্দ হয়েছে।
- ওহ, তোদের ভাল লাগেনি?
- আরে তোমাদের তো সুন্দর বাড়ি। সে তো ঠিকই। কী সুন্দর বাগান সামনে। কিন্তু রীনাদির ভাল লাগা অন্যরকম।
- কী যে বলিস তোরা বুঝি না!
- আহা! বোঝো না? শুধু বলছে শুভুর মা কী ভাল, শুভুর বাবা কী ভাল, ওদের বাড়িটা কী সুন্দর! তোমাকে শুভু বলে কেন?
- ওটাও আমার নাম তো। তবে সবাই জানে না।
- তাহলেই বুঝে নাও! কী ব্যাপার।
আমি আর কথা বাড়াই না। রীনার মাথায় এমনিতেই পোকা আছে। কখন কী কাণ্ড করবে ঠিক নেই। এখন বলছে একরকম। পরে হয়ত আবার উল্টো বলবে। তবে বাবা-মায়ের ব্যাপারে অন্যরকম বলবে না বলেই মনে হয়। ওদের বাড়ি যতটুকু বুঝেছি দুই-চারদিনে, মনে হয়েছে সংস্কার ব্যাপারটা সত্যিই ওদের মজ্জাগত। তবে এখন এসব শুনে বুক ঢিপঢিপ করে উঠল। টুংটাং আওয়াজ হল। কিন্তু ওটুকুই। এর বেশি আর কিছু ভাবতে পারলাম না।
…..দ্রুত সময় চলে যাচ্ছে। কবিতা পেপার শেষ করে মৌলিক স্যার প্রবন্ধের নোটস দিচ্ছেন। মূল প্রশ্নগুলি আমরাই বলছি। নিজের মতো উনি হয়ত দুই-একটা আলাদা কিছু দিচ্ছেন। পড়ার প্রায় দুই মাস হতে চলল। পার্ট টু পরীক্ষার বাকি আর মাস তিনেক।
হঠাৎ গৌরাঙ্গ একদিন একটা অদ্ভুত প্রস্তাব দিল,
- শোন। আমার কাছে স্যারের দেওয়া নভেল পেপারের সব নোটস আছে। ওটা যদি আমরা নিজেরা লিখে নিই, তাহলে অন্তত দেড় মাস সময় বেঁচে যাবে। সঙ্গে একশো কুড়ি টাকাও। তাছাড়া প্রিপারেশনের জন্য বাড়তি সময়ও পাবো।
- তার মানে বলতে চাইছিস, ওই পেপার আমরা করব না। তাই তো?
- হ্যাঁ। স্যার তো নিজেই বলেছেন আমাদের যা দরকার সেটাই উনি দেবেন। নিজের থেকে কিছু নয়। তো আমাদের ওই পেপার দরকার নেই!
- সে তো বুঝলাম। কিন্তু সেটা তো স্যারকে বলতে হবে।
- হ্যাঁ বলতে হবে। তোরা বলবি।
- কেন? তুই বল।
- নোটস আমি দেব আর আমিই বলব? না। নোটস আমার। স্যারকে বলার ব্যাপার তোদের।
- কিন্তু কে বলবে?
- ঠিক কর সেটা।
সবাই খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর দেখি সবার চোখ আমার দিকে। চোখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলাম, - মানে? কী হল? সবাই আমার দিকে তাকাচ্ছিস কেন?
(ক্রমশ)
পর্ব – ১৪
https://www.facebook.com/share/p/17fEgGi2Ld/