রবি আড্ডায় শৌভিক রায়

পর্ব- ১২

মাথায় শুধু ঘোরে কন্যাকুমারী। কিছুতেই সেই ঘোর থেকে বেরিয়ে আসতে পারি না। এক বছর থেকে ওখানকার ভাবনা এমন ঘুরপাক খাচ্ছে যে, ঠিক করলাম বিবেকানন্দপুরমে চিঠি লিখব। যদি জায়গা দেয়।

পারিবারিক ভ্রমণে নানা জায়গায় গিয়েছি আগেও। কিন্তু কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে প্রায় একমাসের দক্ষিণ ভারত বেড়ানো একটা অন্য অভিজ্ঞতা হয়ে আছে। হাওড়া থেকে করমণ্ডল এক্সপ্রেসে মা-বাবা-মানি আর আমি মাদ্রাজ নেমেছি। এত লম্বা ট্রেন জার্নি আমার প্রথম। দুর্দান্ত ট্রেন। খড়্গপুর-ভুবনেশ্বর-বিশাখাপত্তনম-রাজমুন্দ্রি-বিজয়ওয়ারা থামল শুধু। মাদ্রাজ পৌঁছে দিল পাঁচ মিনিট আগে।

মাদ্রাজ সহ মহাবলীপুরম-পক্ষিতীর্থম-কাঞ্চিপুরম-তিরুপতি দেখে পন্ডিচেরির অরবিন্দ আশ্রমের গার্ডেন হাউসে আমাদের সাত দিনের থাকা। ফাঁকা শহর। লম্বা মেরিন ড্রাইভ। পঞ্চাশ পয়সা প্রতি ঘন্টায় সাইকেল ভাড়া করে পন্ডিচেরি চষে বেড়াই আর মাতৃমন্দিরে গিয়ে বসে থাকি। সন্ধে থেকে রাত কাটে সমুদ্রের ধারে। অরোভিল তৈরি হচ্ছে। এটা যে দারুণ একটা ব্যাপার হবে, সেটা দেখেই বুঝেছি। গার্ডেন হাউসেই পরিচয় হল আলিপুরদুয়ারের এক প্রাথমিক শিক্ষক দম্পতির সঙ্গে। তারা হয়ে গেলেন আমার কাকু-কাকিমা। দল ভারী হয়ে গেল। পন্ডিচেরি থেকে মাদুরাই-কোদাইকানাল-রামেশ্বরম হয়ে পৌঁছলাম কন্যাকুমারী। ইন্ডিয়ান পেনিনসুলার একদম প্রান্তে এসে সে এক অদ্ভুত অবস্থা আমার। পন্ডিচেরির কোজাগরী পূর্ণিমার সমুদ্র কন্যাকুমারীতে হয়ে গেল দীপাবলি অমাবস্যার গহন কালো রাত। পূর্ণ জোয়ারে সমুদ্রের সে কী উত্তাল অবস্থা! বিরাট পাথরের ওপর ঢেউ আছড়ে পড়ে রুপোর মতো জল মাঝ আকাশে উঠে যাচ্ছে। দূরে দূরে ফসফরাসের আলো সমুদ্রের মধ্যে নিজেদের মতোই জ্বলছে-নিভছে। লাইটহাউসে উঠলাম এখানেই। দেখে এলাম ত্রিবান্দম, কোভালম, সুচিন্দ্রম, ভট্টাকট্টাই। তারপর কোচিন হয়ে ব্যাঙ্গালোর। আর সেখান থেকে মাইশোর-বৃন্দাবন গার্ডেন।

দক্ষিণ ভারত আমাকে মানসিকভাবে কিছুটা থিতু করল। অনার্স না পেলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাব ঠিক করলাম। কন্যাকুমারীর বিবেকানন্দপুরমে চিঠি লিখবার ভাবনা সেখান থেকেই। এইসব করতে করতেই একদিন টুক করে রেজাল্ট বেরিয়ে গেল। দৌড়লাম রেজাল্ট জানতে। কোচবিহারে। অনিলকাকুই নিয়ে এসেছেন ইউনিভার্সিটি থেকে। রীনা অনার্স পেয়ে গেছে। স্বপন আর করুণার কোয়ালিফাইং মার্কস। আর কেউ অনার্স পায়নি। আমার রেজাল্ট উইথ হেল্ড। এ এক অদ্ভুত অবস্থা। ফেল করলে দুঃখ হবে, পাস করলে আনন্দ। আমার কিছুই হচ্ছে না। ফেরার পথে রীনার বাড়িতে নেমে ওকে ওর রেজাল্ট জানিয়ে এলাম। নিজে কী করব বুঝতে পারছি না।

ছবি- কলেজ দিনের রীনা

চললাম ফালাকাটায়। বাড়িতে বললাম। বাবা পরদিন ইউনিভার্সিটি গেলেন। আমাদের ইউনিভার্সিটির কন্ট্রোলার অফ এক্সাম শ্রদ্ধেয় অশোক ঘোষ যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন বাবার সহপাঠী ছিলেন। তাঁকে আমার রোল নম্বর দিয়ে এলেন। উনি দুদিন পর আমাকে পাঠাতে বললেন। ইউনিভার্সিটিতে।

সত্যিই ত্রিশঙ্কু অবস্থা। খাচ্ছি। স্বাদ পাচ্ছি না। খিদে পাচ্ছে। বুঝতে পারছি না। ঘুম এলে ঘুমোচ্ছি ঠিকই, কিন্তু উঠবার পর মনে হচ্ছে ঘুমোইনি। এভাবে কাটল দুদিন। প্রণবকে নিয়ে পৌঁছলাম ইউনিভার্সিটিতে। দুই নম্বর গেটের কাছে, অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিল্ডিঙের পেছনে, কন্ট্রোলারের অফিস। পর্দা সরিয়ে বললাম,

  • স্যার আসব?
  • কে তুমি?
  • স্যার বাবা এসেছিলেন ফালাকাটা….
  • ও…. নীরদের ছেলে! আয় আয়।
    চেম্বারে ঢুকে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছি। স্যার বসতে বললেন। যতই বাবার বন্ধু হন, আসলে তো উনি আমার স্যার। বসার প্রশ্নই নেই। দাঁড়িয়ে রইলাম চুপচাপ। কানে এলো,
  • কী রে রেজাল্ট উইথ হেল্ড কেন হল?
  • জানি না স্যার….
  • কী প্ল্যান এরপর? মানে পার্ট টুয়ের পর?
  • স্যার অনার্স পাবো কিনা….পার্ট টু তো…..
  • ঠিক ঠিক। অনার্স পাবি কিনা…ঠিক…..
  • হ্যাঁ স্যার।
  • এবার একটা সত্যি বল তো….তোর নিজের কী মনে হচ্ছে এই উইথ হেল্ডের ব্যাপারে….
  • কী বলব স্যার…
  • না না বল বল। কিছু তো একটা মনে হচ্ছে তোর। কেমন দিয়েছিলি পরীক্ষা?
  • স্যার নোটস তো মুখস্থ করতে পারি না। নিজের মতো লিখেছি…
  • বলে যা….
  • ফার্স্ট পেপার যদি বয়স্ক কেউ দেখেন তবে বেশি মার্কস পাব না। কমবয়েসি স্যার হলে কিছুটা পাব।
  • কেন বলছিস?
  • স্যার টি এস এলিয়ট কে নিয়ে লিখেছিলাম। এই প্রজন্মের কাছে ওঁর ব্যাপারটা আলাদা।
  • আর বাকি দুই পেপার?
  • জানিনা স্যার। নিজের মতো লেখা সব।
  • শোন, তোকে একটা কথা বলি। অনার্স মানে বুঝিস তো? এখানে দেখা হয়, তুই নিজে কী লিখলি। কী বুঝেছিস আর কী শিখেছিস। কীভাবে সেটা বলতে পারছিস। নোটস তো সবাই পারবে কমন এলে। কিন্তু সেটা অনেকের এক হয়ে যায়। এভারেজ নম্বর আসে…..তুই পার্ট টু পড়া শুরু করে দে।
  • পার্ট টু?
  • কেন? ইচ্ছে নেই পড়ার? শোন। দুটো পাস পেপারে তো ভালই পেয়েছিস। সিক্সটি পার্সেন্টের ওপর। অনার্সের সেকেন্ড আর থার্ড পেপারেপেয়েছিস ৪৭ আর ৪৭। তা ৪০ পেলেই অনার্স… সেখানে দুই পেপার মিলে তুই ১৪ নম্বর এগিয়ে আছিস। অর্থাৎ ফার্স্ট পেপারে যদি মাত্র ২৬ পাস, তাহলেই অনার্স পাচ্ছিস। আর হ্যাঁ। তোর ধারণাই ঠিক। ফার্স্ট পেপারে দুই এক্সামিনারের মধ্যে তোর খাতায় ২০ নম্বর পার্থক্য হয়েছে। তাই ওটা গেছে থার্ড এক্সামিনারের কাছে। অনার্সে ডাবল এক্সামিনার খাতা দেখেন, জানিস তো? দুজনের মধ্যে কুড়ি নম্বরের পার্থক্য হলে সেটা যায় আর একজনের কাছে।

স্যারের আর কোনও কথা কানে ঢুকল না। কোনও ভাবে ওঁকে প্রণাম করে বেরিয়ে এলাম। থরথর করে কাঁপছি। প্রণব হাত চেপে ধরেছে। রাস্তার ধারে বসে পড়লাম। চোখ ঝাপসা হয়ে গেছে। উচ্চ মাধ্যমিকে ওই রেজাল্ট, সবার বিরূপ চোখে তাকানো, গায়ে সেঁটে যাওয়া বাজে ছেলের তকমা, নেশার ঘোরের এক অদ্ভুত দুনিয়া…. পিঠ দেওয়ালে ঠেকতে ঠেকতে নিঃশ্বাস না নিতে পারার অবস্থা থেকে হঠাৎ এই ঝলমলে আলো চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে আমার। অনার্স পেপারে যেখানে কোয়ালিফাইং মার্কস ৩৮ পেতেই জান কবুল হয়ে যায়, সেখানে দুই পেপারে ১৪ নম্বর এগিয়ে আছি। ভাবতেই পারছি না। সংখ্যাগুলো ভাসছে চোখের সামনে। কী করব বুঝতে পারছি না।

হঠাৎই মনে হল, বাবা-মায়ের পর এই রেজাল্ট শুনে সবচেয়ে খুশি হবে রীনা। ও আমার সহপাঠী। হয়ত প্রতিদ্বন্দ্বীও। নম্বর পাওয়ার দিক থেকে। কিন্তু ও খুশি হবে। ওকে জানাতে হবে দ্রুত যে, আমি টিকে গেছি……

(ক্রমশ)

পর্ব – ১১

https://www.facebook.com/share/p/1iX8ojQ3BC/

By nb24x7

দিনদুনিয়ার খাসখবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *