রবি আড্ডায় শৌভিক রায়

পর্ব – ১০

বাড়ির কাছেই মহামায়া সিনেমা হল। খানিক দূরে ভবানী। মহামায়া সিনেমা হলের পাশেই টাউন হল। বড়দের মুখে শুনেছি, আগে নাকি টাউন হলে ছবি দেখানো হত। চোঙ নিয়ে নতুন ছবির অ্যানাউন্স করতে করতে যেতেন হলের কোনও কর্মচারী। এখন নানা অনুষ্ঠান, নাটক ইত্যাদি হয়ে থাকে এখানে। পুরোনো দিনের এই টাউন হলের ঐতিহ্য আলাদা।

বালুরঘাটের ত্রিতীর্থের নাটক দেখলাম এখানে। নাটকের পরিভাষা ও আঙ্গিক বহুদিন আগেই বদলে গিয়েছিল। ত্রিতীর্থ নতুন করে সেটা প্রমাণ করল আবার। মনে হল, নাটক দেখছি না, চলমান জীবন দেখছি যেন। ফালাকাটায় নাটক করতাম নিয়মিত। নিজেদের নাটকের দল আছে। দিনহাটায় চলে আসার পরেও ফালাকাটায় গিয়ে নাটক করেছি। প্রতিযোগিতায় গিয়েছি। কিন্তু বালুরঘাটের এই নাটকের দলটি সত্যিই আলাদা।

এই সময়েই প্রগতি মঞ্চস্থ করল মনোজ মিত্রের লেখা রাজদর্শন। প্রত্যেকেই অনবদ্য অভিনয় করেছিলেন। কিন্তু নিজের সেজকাকু মদন রায় আর তাঁর বন্ধু ও আমাদের কলেজের সঙ্গে যুক্ত শ্রী সীতাংশু শেখর মুস্তাফির অভিনয় মুগ্ধ করেছিল। সেজকাকুর সঙ্গে আমার বেশ ভাব। কোনও নাটক লিখলে, প্রথম শ্রোতা হলাম আমি। বিশেষ করে এই সময়ে। কেননা দিনহাটায় আছি এখন।

নাটক, যাত্রা, সিনেমার বিজ্ঞাপনে অ্যানাউন্স একটা আর্ট। ফালাকাটায় গৌতম আসোয়ার সেটা বেশ ভাল করেন। দিনহাটায় যাঁরা করেন, তাঁদের নাম জানিনা। শ্রদ্ধেয় নারায়ণ সাহা তাঁর আবৃত্তির জন্য দিনহাটার পরিচিত মুখ। কিন্তু সেটা প্রথাগত আবৃত্তি, ভাষ্য ইত্যাদির জন্য। যাত্রা, সিনেমা ইত্যাদির অ্যানাউন্স একেবারেই আলাদা। খুব কিছু সুন্দর গলা বা উচ্চারণ না হলেও চলে। মোটামুটি কখন কোন শো, ছবির নাম বলতে পারলেই হল। যাত্রার ক্ষেত্রে অবশ্য একটু নাটকীয় করে ঘোষণাগুলো হয়। কখনও উচ্চগ্রামে, কখনও টেনে টেনে, কখনও গলা খেলিয়ে। খুব মনোযোগ দিয়ে সেসব শুনি। বেশ মজা লাগে।

একদিন রাতের বেলায়, ভজনদের দোকানের সামনে আড্ডা দিচ্ছি, ভবানী সিনেমা হলের মাইকিং কানে এলো- আগামীকাল, রবিবার, দুপুর সাড়ে এগারোটায় ভবানী সিনেমা হলে দেখুন ক্যানোন দি বারব্রেন.... বার কয়েক শুনেও ছবির নাম মাথায় ঢুকল না। এগিয়ে গিয়ে রিক্সার গায়ে সাঁটা পোস্টার দেখলাম- Conan the Barbarian…. আর্নল্ড সোয়ার্জেনেগারের ছবি। শুদ্ধ করে দিলাম যিনি অ্যানাউন্স করছেন তাঁকে। ছবির নাম এই। এরপর কোনান ঠিক হলেও, বারবারিয়ান ঠিক হল না। বুঝলাম মানুষটি আমার মতো ভুলভাল ছেলের ওপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে পারেননি।

সপ্তাহে একটা ছবি তো বটেই, কখনও দুটো-তিনটে ছবিও দেখি। বেশিটাই নাইট শো। সঙ্গী কখনও জীবনদা। কখনও মধু বা ভজন। ম্যাটিনি দেখলে সঙ্গে বাবুন। ছবির ব্যাপারে জীবনদার একটা থিয়োরি আছে। ও সব ছবি দেখে। বাদ নেই একটাও। দেখা ছবি আবার দেখতে যায় কেউ সঙ্গে গেলে। ছবি কেমন জানতে চাইলে বলে- আছে। ছবিটি খারাপ লাগলে যদি বলা যায়, ধ্যাৎ বেকার ছবি, তুমি বললে ভালই। ওর উত্তর হবে, তরে কইলাম না আছেএএএ। আর ভাল লাগলে তো কথাই নেই। জীবনদা ক্রেডিট নিত, আগেই তো কইছি, আছে!

আমাদের ছবি দেখার কোনও মা-বাপ নেই। হলেই হল। কখনও ইন্টারভ্যালের পর মনে হত আর এই ছবি তো আগে দেখেছি! কোনও ছবিতে আবার সানি দেওল ভেবে অনেকটা দেখে আবিষ্কার করি ওটা রাজ বব্বর। শোলে যতবার আসে, ততবার দেখতে যাই। তবে অদ্ভুতভাবে একমাত্র আমিই বোধহয় বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না' দেখলাম না। মহামায়া সিনেমা হলে ছবিটি রমরম করে এক মাসের ওপর চলল। ছবি দেখে কার কী হল জানি না, আমার বড়কাকুর ছেলে অর্থাৎ ভাই, নিজের মাকে বেদের মেয়ে বলতে শুরু করল। কেননা বড় কাকিমার নাম জ্যোৎস্না।

আমাদের মাতিয়ে দিল Love…the Crime of the Century শীর্ষক ছবিটি। কেউ কেউ বেশ কয়েকবার দেখে ফেলল। আমি অবশ্য দুবারই ইতি টানলাম। তাও পরের বার ফালাকাটা থেকে বন্ধু পুটন এসেছিল বলে ওর সঙ্গে গেলাম। আমির খানের লিপে উদিতনারায়ণের পাপা কহতে হ্যায় যেন আমাদের সবার গান হয়ে উঠল। জুহি চাওলাকে স্বপ্নে দেখতে শুরু করলাম কম বেশি প্রত্যেকেই। ছবিটির নাম আসলে ক্যায়ামত সে ক্যায়ামত তক। তবে পোস্টারের ওপরে ইংরেজিতে ওই কথাগুলিও ছিল। মহামায়া হলের দিকে যেতে, মাঠ শুরু হওয়ার আগে, ডানদিকের দোকানগুলির শেষটি ছিল একটি মিষ্টির দোকান। তার সামনে এই পোস্টারটি, অখণ্ড মনোযোগ দিয়ে কেবল দেখি আর জুহির কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলি। তবে ওই অবস্থা কেটে গেল আর একবার লাওয়ারিশ দেখে। আপনি তো জ্যায়সে ত্যায়সে... বারবার শুনে মনে হল, এটাই ঠিক। না কেউ আগে, না কেউ পিছে। চল পানসি বেলঘরিয়া। তবে শুধু ক্যায়ামত সে ক্যায়ামত তক বা কিছুটা পুরোনো লাওয়ারিশ নয়, বলার মতো অনেক ছবিই ছিল। সেসব আর উল্লেখ করছি না। তবে মিঠুন চক্রবর্তীর উত্থান দেখতে পাচ্ছিলাম। আর অমিতাভের অগ্নিপথএক দুরন্ত ছবি হয়েছিল ১৯৯০ সালে।

ছবি- দিনহাটা শ্রী গুরু প্রপন্ন আশ্রম। এখানেই চলত ছোটদের ক্লাস। সেই অর্থে আমার প্রথম স্কুল। (বর্তমান ছবি)

ক্যায়ামত সে ক্যায়ামত তকদেখতে গিয়ে বহুদিন পর কিংশুকের সঙ্গে দেখা। ওরা একসময় ফালাকাটায় ছিল। ওর দাদার নাম কৌশিক ঘোষ। ওদের বাবা ছিলেন ফালাকাটা স্টেট ব্যাংকের ম্যানেজার শ্রদ্ধেয় কল্যাণ ঘোষ। কৌশিকদা ক্রিকেট খেলার পাশাপাশি, পড়াশোনাতেও ভাল ছিল। কিংশুকও কম যেত না। ফালাকাটা স্টেট ব্যাংকের আর এক ম্যানেজারও দিনহাটায় বদলি হয়েছিলেন। ওঁর আসল বাড়ি ছিল কোচবিহারের ধর্মতলা মোড়ের কাছে। ওঁর দুই পুত্র সন্তান শিবতোষ ও ভবানী এবং এক কন্যা লায়লি একই বয়সী ছিল বলে, ফালাকাটায় আমি, পুটন, প্রণব, বাপি ছিলাম ওদের খেলার সঙ্গী। দুই ম্যানেজারের ফালাকাটার পরেই দিনহাটায় বদলি, দিনহাটা-ফালাকাটার যে কিছু একটা সম্পর্ক আছে সেটা যেন বলে দিত। থমাস হার্ডির উপন্যাসের মতো সেই বিখ্যাত fate and inescapable doom বলেই মনে হত।

মহামায়া সিনেমা হলের সঙ্গে লাগানো মাঠ হলের মাঠ নামেই পরিচিত। দিনহাটার ফুসফুস এই মাঠ। এক্সচেঞ্জ মোড়ের রাস্তা পার করলেই ওপারে থানার মাঠ আর দিঘি। সিনেমা হলের পেছনে জলাজমির মাঝখান দিয়ে রাস্তা উঠে গেছে এক্সচেঞ্জ পাড়ায়। সেই রাস্তায় উত্তরে গেলেই মদনমোহন পাড়া। হলের মাঠ আমাদের অনেক রাতের আড্ডাখানা। গরমের দিনে ছোট ছোট দলে বহু রাত অবধি হাওয়া খাই। সঙ্গে দেদার সিগারেট-বিড়ি চলে। নাইট শো-এর ছবি দেখতে বোর লাগলে, মাঠে এসে বসে থাকি। ভবানী সিনেমা হলের এই সুবিধে নেই। চাপা রাস্তার ধারে হলটি। পেছনে দিনহাটার কুখ্যাত নিষিদ্ধ পল্লী। সুতরাং কোনও দিকে যাওয়ার প্রশ্ন নেই। নাইট শো দেখে এসে আমার ঘরে সসপ্যানে ঢেকে রাখা ভাত খাই প্রায় মাঝরাতে। এর ফাঁকেই পড়া চলে কখনও।

কলেজে পরের ব্যাচের বিভূতির সঙ্গে বেশ ভাব হয়েছে। ছেলেটির অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের। কিন্তু পড়ায় নিষ্ঠা রয়েছে। কখনও পড়া বুঝে নেয়। বাকি সময় আড্ডা দিই। ও কবিতা লেখে। আমি অবশ্য নিতান্ত পাঠক। ওর সঙ্গে মাঝেমাঝে কোচবিহারে আসি। ওদের ব্যাচের কাকলি আর সোমার বাড়িতে গেলাম একদিন। কাকলিদের বাড়ি নরসিংহ দিঘির ধরে। ওর ভাইয়ের নামটি খুব পছন্দ হল। শঙ্খশুভ্র। সোমাদের বাড়ি নিউটাউন পোস্ট অফিস মোড় থেকে আরও একটু সামনে এগিয়ে।

সিনেমা, রাতের আড্ডা, উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়ানো….এই ভাবেই দিন কাটছে। গায়ে খারাপ ছেলে তকমা সেঁটে গেছে। পড়া পারি বলে স্যারেরা স্নেহ করেন। কিন্তু সেটা কলেজেই। তাঁরা তো অন্য সময় আর দেখেন না! ইতিমধ্যে শওকত আলি স্যারের সঙ্গে আমাদের বন্ধু পারভিনের বিয়ে হল। ওকে আমরা লাভলি বলেই ডাকি। স্যার যেন এক ঝটকায় অনেকটা কাছের হয়ে গেলেন। বন্ধুর বর বলে, আগের সেই ভীতিটা কেটে গেল। আমাদের আর এক বন্ধু সোনাও (রোমি) বিয়ে করে বসল। ওর বর মধুদার ফোটোগ্রাফির দোকান আছে। সেই দোকানে আমরা ছবিও তুলেছি বেশ কয়েকবার।

পার্ট ওয়ান পরীক্ষা এগিয়ে আসছে। যাদের অনার্স নেই, পাস করলেই তাদের ছুটি। আমাদের আরও একবছর থাকতে হবে। শুনতে পাচ্ছি বিষ্ণু, মহামায়া, স্বপন, করুণা প্রত্যেকেরই দারুণ প্রস্তুতি। প্রচুর নোটস মুখস্থ করেছে। রীনা, স্বাতী, পাঞ্চালিও বোধহয় ভালই করছে। আমার কোনও নোটস নেই। মুখস্থ কোনও কালে করতে পারিনি। শুধু ঘুরে বেড়াই আর মাঝে মাঝে টেক্সট উল্টেপাল্টে দেখি।

বুঝতে পারছি, এক চরম বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু ফেরার কোনও ইচ্ছে জাগছে না। ঘোরের যে জগত, সেটাকেই যেন আরও আপন করে নিচ্ছি। কোনও পিছুটান নেই। জীবন শেষ হয়ে গেলেও বোধহয় কিছুই হবে না…..

(ক্রমশ)

পর্ব – ৯

https://www.facebook.com/share/p/1NXrorwTz7/

By nb24x7

দিনদুনিয়ার খাসখবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *