রবি আড্ডায় সাধন দাস

শিবুধোপা পাড়াতুতো জ্যাঠা। হদ্দ কুঁড়ে। এক কুড়ি কাপড় ঠেঙিয়ে ডাঙায় উঠতে দুপুর লাগিয়ে দেয়। জেঠিকে কাজ তাঙড়ে খ্যাটন ফোটাতে হয়। অগত্যা তাকে জলে নামতে হয়। নৈমিত্তিক ফের। তখন মাঠ সামলায় কালো। ব্লিচিংএ কাপড় চুবানো, নিংড়ানো, মেলা, তোলা। খুঁটোয় বাঁধা কালি গায়ে পায়ে দড়ি জড়িয়ে একসা করে। সে হ্যাপাও কালোর ঘাড়ে।  কুঁড়েজ্যাঠার বদামিতে কালোদের দিন চালানো খুব ঝক্কি ব্যাপার! একটা না একটা ঝঞ্ঝাট বাঁধবেই।   

কালো, কালি হরিহর আত্মা। ঘাটে মাঠে কালো যে বঙ্গেই যাক কালি যায় সঙ্গে। কালো কালি জড়াজড়ি করে ঘুমায় রাতে। বিছানা (মানে চটের বস্তা। বালিশ হচ্ছে খদ্দেরের ময়লা কাপড়ের পুঁটলি।) হলুদ হিসিতে ভেসে যায়। বোঝা দায় কার! 

সকালে ঘাটে কালিকে খুঁটোয় বেঁধে কালো মাঠে কাজে নামে। দু’জনেরই গায়ে বিতিকিচ্ছিরি পেচ্ছাবের গন্ধ। আমিও কালো কালির গা ঘেঁষে করে কাজ করি। আমার গায়েও গন্ধ জড়ায়। স্কুলে যাওয়ার সময় হয়, থৈ থৈ কাজের চাপে স্নান হয় না। খাতা বই পত্তর ঘাটে এনেই রাখা থাকে। বোল, ব্লিচিং, ছাগলের পেচ্ছাব, ভাঁটির গন্ধ মাখা গায়ে আমি কালো কালি তিনজনই ঘাট থেকে দৌড়াই স্কুলে। স্কুলের বাচড়ায় কালিকে বেঁধে ক্লাসে ঢুকতে কালোর দেরি হয়ে যায়। ক্লাসটিচার ওকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখেন। দু’এক মিনিটের তফাতে ক্লাসের ভিতর থেকে আমি কাঁদো কাঁদো মুখে ওর দিকে তাকিয়ে থাকি যেনো ভিতরে ঢুকে ভুল করে ফেলেছি। ও জানলার বাইরে থেকে হাসি হাসি মুখে আমাকে সান্ত্বনা দেয়। কালির গলা জড়িয়ে বাচড়ায় অপেক্ষা করে। ফার্স্ট পিরিয়ডের শেষে ঘণ্টা পড়লেই ক্লাসে ঢুকবে।     

কালোর ইচ্ছে কালিকে খাসি করে। কালি বড়ো হবে। তেলচুকচুকে গা। জামা প্যান্ট, জুতো মোজা পরিয়ে স্কুলে নিয়ে যাবে। স্কুলে-পড়া জ্ঞানী ছাত্রের মতো হেলতে দুলতে যাবে। গার্লস স্কুলের মেয়েরা তারিয়ে তারিয়ে দেখবে, জিভ দিয়ে লালা ঝরবে। কুঁড়েজ্যাঠা  কিছুতেই কালিকে খাসি করতে দেবে না। বোকাপাঁঠা বানাবে। বকরিদের উপর খাটিয়ে ব্যবসা করবে। বোকাপাঁঠার ঘাড়ে বসে খাবে। বকরি মালিকদের আগাম জানান দিয়ে রাখে।  

জ্যাঠার তড়িঘড়ি তদবিরে মালিকরা ঘাটেই ছাগলি নিয়ে আসে। কালি সবে তেল চুকচুকে হতে শুরু করেছে। পু্রো বোকা হয়ে উঠতে পারেনি। গা দিয়ে বোঁটকা গন্ধও ছাড়েনি। গন্ধ না পেলে ছাগলিরা পিঠে উঠতে দেয় না। কালিও যার তার পিঠে চাপতে চায় না। না চাপলেই জ্যাঠা রাগে গরগর করে। কালো কালি দু’ইই জেঠির ছেলে। বিপদ বুঝতে পেরে ব্লিচিংয়ের দুধে কাপড় চুবানো ফেলে জেঠি দৌড়ায়। কালি ‘মা-র’ হাতে ধরা দেয় না। ‘আদর করে মা ভালো ভালো কথা বলে কিন্তু কাজ করে বাবার পক্ষে।’ দড়ি বাঁধা বৃত্তের এলাকায় বন্দী হয়ে কালি ছোটে। কালোও বাঁচাতে ছোটে কালিকে। ভয়ে দু’জনে ভ্যাঁ ভ্যাঁ চেঁচায়। বেঁচে থাকার বৃত্ত তৈরি করে। জেঠি ওদের সাথে দৌড়ে পারে না। বসে পড়ে। দড়ি টেনেটেনে বৃত্ত ছোটো করে। কালিকে হাতের কাছে এনে বোঝাতে চায়, বাবার কথা শুনতে হয়। ‘কালি যেনো মা-র কথা না শোনে’, জেঠির আওতার বাইরে রাখতে কালো দড়ি ধরে উলটো টানে, বৃত্ত বড়ো করে। ‘মা বেটাদের টাগ অফ ওয়ার চলে। ছেলেদের জোরের কাছে মা হেরে যায়। গায়ের জোরে না পেরে মা কান্নার জোর খাটায়। কাঁদে।’ কান্নার কাছে কালি কালো আত্মসমর্পণ করে। কালো কালি বোকাপাঁঠার কাজ করতে বাধ্য হয়। কালো কালির সামনের পা দুটো তুলে বকরির পিঠে চাপিয়ে দেয়। জেঠি কাঁদতে কাঁদতে বলে- মার ঠেলা। 

ছেলেমানুষ কালি ফেল মারে। পাঁচন হাতে জ্যাঠা জল থেকে উঠে আসে। কালো বুঝতে পেরে কালিকে জড়িয়ে ধরে। জেঠি জাপটে ধরে ছেলে দুটোকে। জ্যাঠা কালিকে ঠ্যাঙায়। কিন্তু ঠ্যাঙানি খায় তিনজনেই। জ্যাঠা বলে – তোরা ফেলু ফেলু ফেলু।  

কালো আছাড়িপিছাড়ি কাঁদে- আর মেরো না, বাবা। কালি মরে যাবে। 

– কালি মরে গেলে তোকেই বোকাপাঁঠা বানাবো। 

By nb24x7

দিনদুনিয়ার খাসখবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *