
রবি আড্ডায় সন্তু সাহা
বছর খানেক আগেকার ঘটনা। একদিন চুল কাটাতে গিয়েছি এক ইউনিসেক্স স্যালনে। ঢুকেই দেখি তিনটে চেয়ার—একেবারে বাঁদিকে একজন ভদ্রমহিলা বসে আছেন। তাঁকে নিয়ে দু’জন স্টাফ ব্যস্ত। মহিলার মুখটা ঠিকমতো দেখতে পেলাম না, কারণ তাঁর মাথা এমন কোণে ঘোরানো যেন মনে হচ্ছিল চুলের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর অক্ষও সোজা করা হচ্ছে।
আমি মাঝের চেয়ারটায় গিয়ে বসলাম। আমি এই স্যালনের একেবারে ডেলি গরিব কাস্টোমার। মানে, খুব দরকার না হলে আসি না—আর এলে স্টাফরা এমনভাবে দেখে যেন ভাবছে, “আবার এল!”
স্টাফদের সঙ্গে ভদ্রমহিলার কথাবার্তা শুনে মনে হল, তিনি মাসে অন্তত একবার এখানে আসেন। আর কথাগুলো শুনে যতটুকু বুঝলাম, চুল, স্কিন, স্পা—সব মিলিয়ে তিনি মাসে যত টাকা খরচ করেন, ওই টাকায় আমার ছোটখাটো সংসার দিব্যি চলতে পারে। তার ওপর আবার অকেশনে স্পেশাল সাজ তো আছেই।
এখন তিনি নিজে বড়লোক, না তাঁর বর বড়লোক—সে রহস্য তখনও অমীমাংসিত।
আমি একটু বাঁদিকে মুখ ঘুরিয়ে ভদ্রমহিলাকে আরেকবার দেখার চেষ্টা করলাম। কিন্তু যে ছেলেটি আমার চুল কাটছিল, সে সঙ্গে সঙ্গে আমার মাথাটা দু’হাত দিয়ে আবার সোজা করে দিল।
আমি ডানদিকে মুখ ঘুরিয়ে আবার সোজা হলাম। তারপর ছেলেটিকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম,
—“ঘাড়টা একটু ব্যথা করছে। তাই মাঝে মাঝে বাম-ডান করছি।”
এইসব কৌশল অবশ্য আমি শিখেছি মিস্টার বিনের কাছ থেকে।
ওদিকে ভদ্রমহিলার চুলে নানান পরিকল্পনা চলছে—
“বাটারফ্লাই কাট করবেন ম্যাডাম?”
“Keratin Hair Spa?”
“Moroccan Hair Spa?”
ঠিক তখনই আরেকজন ভদ্রমহিলা স্যালনে ঢুকলেন। তিনি এসে আমার ডানদিকের চেয়ারে বসলেন। কথাবার্তা শুনে বোঝা গেল, এই স্যালনে তিনি প্রথম এসেছেন। খুব হিসেব করে সবকিছুর রেট জেনে নিচ্ছেন। দেখে মনে হল সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ।
তিনি জানালেন, তাঁর একটু তাড়া আছে।
এইবার স্যালনের স্টাফদের অ্যাটেনশন বাঁদিক থেকে একটু ডানদিকে সরে গেল। এতে বাঁদিকের ভদ্রমহিলা স্পষ্টই একটু বিরক্ত হলেন।
শেষে আর না পেরে বলেই ফেললেন—
—“এই ভাই শোনো, আমার কিন্তু একদম সময় নেই। সাতটার মধ্যে আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে। প্লিজ আমার কাটিংটা শুরু করো।”
স্টাফ বলল—
—“আচ্ছা ম্যাডাম, হয়ে যাবে।”
ডান আর বাঁ—দু’জনেরই তাড়া। মাঝখানে আমি।
আমার কোনো তাড়া নেই। বাড়ি গেলেই হলো।
এর মধ্যেই বাঁদিকের ভদ্রমহিলার ফোন বেজে উঠল। তিনি ফোন তুলে এমনভাবে কথা বলতে লাগলেন যাতে গোটা স্যালন শুনতে পায।
ফোনে একদিকের কন্ঠস্বর শুনে যেটুকু বোঝা গেল তার সারমর্ম এই যে—
বর একজন মস্ত বড় ডাক্তার। নাম নীলাঞ্জন। রাত আটটাতে একজন হেভি ওয়েট পলিটিক্যাল লিডারের ওটি আছে। বউ বাড়ি না ফিরলে তিনি বেরোতে পারবেন না। কেন বেরোতে পারবেন না, সেটা বোঝা গেল না।
আমি মনে মনে ভাবলাম—বাহ! শহরের নামকরা ডাক্তারের স্ত্রী! তা হলে একটু আলাদা খাতির তো হবেই।
এদিকে সমস্যাটা হল, স্যালনে মোটে দু’জন হেয়ার কাটার। আমার চুল অর্ধেক কেটে আমাকে ফেলে রেখে অন্যদিকে যাওয়াও যাচ্ছে না। কারণ আমার সামনে যে চুলগুলো আছে, সেগুলো এতটাই কার্লি যেন শীতকালে লাউডগা সাপ কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে আছে! ওগুলো ঠিকঠাক করতে সময় লাগছে।
বাঁদিকের ভদ্রমহিলা এই অবস্থায় বেশ খুশি। কারণ, এখন সমস্ত অ্যাটেনশন এখন তাঁর দিকে।
ঠিক তখনই ডানদিকের ভদ্রমহিলার ফোন বেজে উঠল।
তিনি ফোন তুলে বললেন—
—“হ্যালো, নীলাঞ্জনবাবু, বলুন।”
আমার কান তখন খাড়া।
—“নো টেনশন। মোটেও দেরি হচ্ছে না।”
—“মোস্ট প্রবাবলি আপনার মিসেস আর আমি একই স্যালনে আছি।”
—“ওর হেয়ার কাটিং শেষ হলে আমারটা শুরু হবে।”
ফোনটা রেখে তিনি নিশ্চিন্তে বসে রইলেন।
ডক্টরের বউ আবক! আমি অবাক এর স্কোয়ার। স্টাফগুলো অবাকের কিউব।
ডাক্তারের বউ তখন একটু অবাক হয়ে বললেন—
—“আপনি আমার বরকে চেনেন?”
ডানদিকের ভদ্রমহিলা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—
—“চিনি তো বটেই। আপনার বরের যে ওটি টিম আছে, তার লিডার আমি। ডক্টর সুচেতনা মুখার্জী।”
তারপর শান্ত গলায় যোগ করলেন—
—“পেশেন্টের কন্ডিশন খুব ক্রিটিক্যাল। ওকে জার্নি করানো যাবে না। তাই আমাকে বাধ্য হয়ে কলকাতা থেকে এখানে ছুটে আসতে হয়েছে।”
তারপর যা ঘটল, তা নিয়তির স্বাভাবিক নিয়মে ঘটল। কাঁচি, হেয়ার ড্রায়ার, চিরুনি—সব নিয়ে স্যালনের সমস্ত স্টাফ আমাকে আর বাঁদিকের ভদ্রমহিলাকে ফেলে হুড়মুড় করে ডানদিকে চলে গেল!
আমি, মাঝখানে ঘাটের মড়া, কাবাব মে হাড্ডি হয়ে বসে আছি। আমাকে আধ কাটা করে মানে আমার চুল অর্ধেক কেটে স্টাফবয় ডানদিকে চলে গেছে। বামদিকের মহিলার দিকে তাকাতেই দেখি, দুজন ফিমেল স্টাফ হাতে শসা আর ময়দা জাতীয় কিছু একটা নিয়ে ভদ্রমহিলার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
মনে মনে ভাবলাম, এই সময় আমার বউ যদি ফোন করে তাহলে সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলব,
অ্যানাস্থেসিয়ার ব্যাগটা রেডি রেখো তো। আজকে কিন্তু একটা বড় ওটি আছে। চুল কাটাতে এসে ফেঁসে গেছি এখানে।
তারপর দেখব, স্যালানের স্টাফরা কোনদিকে ছুটে আসে!!!