
রবি আড্ডায় দীপাঞ্জন ঘটক
আজ সকালটা শুরু করেছিলাম কাল রাতে দেখা একটা ভুতের ছবির কথা বলে। একরকম ভুতের সাথে আমার কয়েকবার দেখা হয়েছে।
বিজ্ঞান মঞ্চের হয়ে কাজ করতে একটি স্কুলে গিয়েছি। সেই স্কুলে নাকি ভুত দেখা যাচ্ছে। ভীষণ ভৌতিক বিষয়৷ স্থানীয় নেতাদের মধ্যস্থতায় গ্রামের মানুষজন ভুত তাড়ানো ওঝা ডেকে যে গাছ আর ছবির জন্য ভুত দেখা দিচ্ছিল, সেসব ভেঙে জলে ফেলেছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ তো ভীষণ চিন্তায়। আমরা গিয়েছি, ছাত্রছাত্রীদের সাথে কথা বলতে। সেখানে গিয়ে জানলাম, ভুতের প্রভাবে যে বাচ্চা মেয়েটি আত্মহত্যা করেছিল বলে জানা গেছে, বাড়ি থেকে তার বিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করছিল। কিন্তু সে বিয়ে করতে চায়নি, পড়াশোনা করতে চেয়েছিল। গিয়ে বুঝলাম, বাচ্চারা ভুত বিষয়ে ততটা চিন্তিতই নয়, চিন্তিত বড়োরা। এটাও বুঝলাম, খুব পরিকল্পনা মাফিক বড়োদের মধ্যেই ভুত ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অন্য একটি পৃথক ঘটনায় দেখেছি আমাদের এক প্রাক্তন ছাত্রী শ্বশুরালয়ে গঞ্জনা শুনতে শুনতে মানসিকভাবে এমন পরিস্থিতিতে পৌঁছায় যে অসংলগ্ন আচরণ করতে শুরু করে। শ্বশুরবাড়ির লোকজন সহ গ্রামের লোক মনে করতে শুরু করে যে তাকে ভুতে ধরেছে। আমার মনে হয়েছিল, এরপর দুটি ঘটনা ঘটনার সম্ভাবনা আছে, নেতাদের মধ্যস্থতায় মেয়েটিকে তার বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে বা মেয়েটি ক্রমাগত অত্যাচারিত হতে হতে আত্মহননের পথ বেছে নেবে। মজার বিষয় হল, উভয় ক্ষেত্রেই দায়ী থাকবে সেই ভুতটিই।
দুটি ঘটনা খুব কাছ থেকে দেখে আমার মনে হয়েছে ভুত, ডাইনি, অপদেবতা আসলে রাষ্ট্রের একটা হাতিয়ার। যেখানে সিস্টেম ব্যর্থ হয়, একটা কাল্পনিক ভুত বা বাস্তবে কাউকে ডাইনি বানিয়ে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেওয়া বা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দৈনদশার কারণে শিশুমৃ*ত্যুর মতো ব্যর্থতাকে রাষ্ট্র ঢেকে দিতে পারে সহজেই। জনরোষ গিয়ে পড়ে ভুত বা ডাইনির ওপরে৷ তাই রাষ্ট্র চায়, ভুত বা ডাইনিরা মানুষের কল্পনায় বেঁচে থাকুক। যাতে মানুষ চাইল্ড ম্যারেজ, ডমেস্টিক ভায়োলেন্স, দুর্বল স্বাস্থ্য পরিকাঠামোকে ঠেকাতে না পারা সিস্টেমের ব্যর্থতার দিকে আঙুল তুলতে না পারে।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবশ্য রাষ্ট্র এই ব্যর্থতা বা দুর্নীতিকে ঢাকতে ‘টেইন্টেড’, ‘আনটেইন্ডেড’, ‘নট স্পেসিফিকালি টেইন্টেড’, ‘ফ্রেশার’, ‘এক্সপেরিয়েন্সড’, ‘উকিলের বক্তব্য’, ‘বিচারপতির মন্তব্য’-র মধ্যে সবকিছু গুলিয়ে দেয়। আমরা যে কোনো একটা পক্ষ নিলেই অন্যপক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে ফেলি। আমাদের ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে শান্ত হওয়ার মতো একজন ‘অপর’ মেলে। ক্ষোভ উগড়ে দেওয়ার মতো একটা ভ্যালিডেশন আমরা নিজেরাই খুঁজে নিই। মাঝখান থেকে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা বা দুর্নীতি একটা এসকেপ রুট পায়। পালিয়ে বেঁচে যাওয়ার পথ। রাষ্ট্র তখন কোনো মন্তব্য করে না। চুপ করে সবটা দেখে। জন অরণ্যে মিশে থাকা রাষ্ট্রের পেয়াদারা সাধারণ মানুষ সেজে আমাদের লড়িয়ে দেয়। আমরা লড়তে থাকি। লড়তেই থাকি। লড়তেই থাকি।