
রবি আড্ডায় সাধন দাস
ফোগলা বুড়ি ‘পাঁচ’ বলতে পারে না। বললো, প্যাঁচে পড়লো। আজ নাতির জন্মদিন। দশ/বারোজনকে খাওয়াতে হবে। বুড়ির অর্ডার। সকাল সকাল বাজার গেছি। মাংসের দোকানে ভীড়। বৃদ্ধাকে পেছন থেকে দেখেছিলাম। খানিকটা আমার বুড়ির মতোই দেখতে। বেঁটে, কালো, সাদা নুড়ি চুল। তাকিয়েছিলো দাম লেখা বোর্ডে, আমিও। খাসির মাংসের কেজি বেড়ে ন’শো হয়েছে। বৃদ্ধা ভীড়ের ফাঁক গলিয়ে কসাইয়ের কাছে পৌঁছুতে চাইছিলো। বৃদ্ধাও ফোগলা। চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ছাঁটের দাম বেড়েছে নাকি?
আমার লাগতো সাড়ে চার কেজি। পকেটের ওজন বুঝে তিন কেজিতে নেমে এলাম। কেজি খানেক নাড়ি ভুঁড়ি ছাঁট দিয়ে পুষিয়ে নেবো। আর পাঁচশো গ্রামের নোলা না হয় বুড়োবুড়ি সামলাবো। ছাঁটটা আমার দরকার। ঠেলেঠুলে বৃদ্ধাকে পেছনে ফেলে দিলাম। ভীড়ে হারিয়ে বৃদ্ধা দু’ তিনবার চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো। কথা আধো বেরুলো, কিছু বেরুলো না। বাকি ভীড়ে হারিয়ে গেলো।
মেনুতে চাটনি আছে। কাঁচা আম কিনছি। পেছনে হৈ চৈ। ভদ্রলোকও আম কিনবেন। ফিরেই চিনতে পারলাম। উনি আমার আগে ঐ দোকানেই মাংস কিনেছেন। ঝোলা মাটিতে রেখে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই বৃদ্ধা এখানেও। নাকি ওনার মাংসের ঝোলা চুরি করে পালাচ্ছিলো। ধরে ফেলেছেন। বিস্তর চেঁচামেচি। লোক জমে গেছে। বৃদ্ধা ফোগলা মুখে বারবার বলছে, ব্যাগটা সরিয়ে রাখছিলাম। কেউ বুঝতে চাইছে না, কেউ বুঝতে পারছে না। একের পর এক খিস্তি, চোরদের অন্য কোথাও মারলে নাকি লাগে না। মুখে চড়ের পর চড়। বৃদ্ধা প্রাণপণে মুখ আড়াল করতে চাইছিলো ঘোমটা টেনে। মুখখানা যেনো কেউ দেখে না ফেলে! আর সবাই ঘোমটা খুলে ওর মুখ সবাইকে দেখাতে চাইছে। টানাটানিতে ঘোমটা ছিঁড়ে ফর্দাফাঁই।
মাঝে মাঝে বাজার যাই। বৃদ্ধাকে দেখি। আজকাল একা আসে না। সঙ্গে নাতি থাকে। আমার নাতির বয়সীই হবে। বৃদ্ধার শাড়িটা সেদিন ছিঁড়ে ফুটিফাটা হয়ে গেছে। মনে হয়, একখানাই শাড়ি। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে যেভাবেই পড়ুক মুখ আর ঢাকে না। পচা, নষ্ট, পড়ে থাকা সবজি, ফেলে দেওয়া মাছের আঁশ কুড়িয়ে বাজার করে। বৃদ্ধা মাটি থেকে যখন কিছু কুড়িয়ে ব্যাগে তোলে নাতি চেঁচিয়ে বাজারের সবাইকে জানায়, আমরা চুরি করছি না।