রবি আড্ডায় সোমা সরকার



মানবজীবন সহজ সরল নয়।
জন্মেই অন্য প্রাণীদের মতো ছুটে বেড়ানোর ক্ষমতা তার নেই। জীবনের প্রথম কয়েক বছর সে পুরোপুরি নির্ভরশীল অন্যের ওপর। মানব শিশুর জন্মের পর ছোট্ট রক্ত-মাংসের এক টুকরো পুতুলকে তিলতিল করে গড়ে তোলে বাবা-মা—আর তার সঙ্গে যুক্ত হয় অগণিত ভালোবাসার হাত।

ছোটোবেলায় যখন বাচ্চার ভাষা বাবা-মা বুঝতে পারতেন না,তখনও আশ্চর্য এক নিয়মে তারা পূরণ করে ফেলতেন তার প্রতিটি চাহিদা। ধীরে ধীরে সেই ছোট্ট প্রাণ বড় হতে শুরু করে। নিজের মনন জগতে কল্পনার পাহাড় গড়ে তোলে,আর সেই পাহাড় সে কতবার জয় করে— হয়তো সেও জানে না।

কল্পনা আর বাস্তব মিলিয়ে গড়ে ওঠে গল্প।
আর সেই গল্পের মাঝেই শুরু হয় তার লড়াই—
কল্পনার জগতের সাথে বাস্তব জগতের। পড়াশোনা, গান-বাজনা, খেলাধুলার নামে ধীরে ধীরে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয় এক অসম প্রতিযোগিতায়,
যেখানে ইচ্ছে না থাকলেও “জিততেই হবেই”— এই বোঝা কাঁধে চাপে।

কখনো জেদ, কখনো রাগ, কখনো কান্না…
বাবা-মায়ের সান্ত্বনা তখন তার মানসিক শক্তির খাদ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু সবাই সান্ত্বনা দিতে জানে না—
অনেকে বরং চাপিয়ে দেয় কঠিন শব্দ: “করতেই হবে”, “পারতেই হবে”।যে বাবা-মা একসময় সন্তানের না-বলা কথাও বুঝতেন, তারা বড় হয়ে ওঠা সন্তানের মন বুঝতে পারেন না। ফলে মনের ভেতরে জন্ম নেয় মাকড়শার জালের মতো এক দুর্ভেদ্য জাল—
আক্ষেপ, অবহেলা আর নীরব কষ্টের বোনা জাল।
খুব ধীরে… খুবই ধীরে। যা ভেদ করে মনের গভীর খাদে উঁকি দেবার ক্ষমতা কারোর থাকে না।

মানুষগুলো এগিয়ে চলে—মুখে হাসি, কথায় কখনো স্পষ্টতা, কখনো আনমনা অসংলগ্নতা নিয়ে।
সাথে থাকে অস্থিরতা, ছটফট ভাব। কেউ সেই ভাবকে হার মানিয়ে জীবনে এগিয়ে চলে, কেউ পারে না।
ছন্দ কেটে যায় জীবনের। বাবা-মা, আত্মীয়, বন্ধু— কেউ টের পায় না। অজান্তে মনে তৈরি হয় গভীর খাদ…
প্রচণ্ড গভীর সেই খাদ! যার তল মাপার ক্ষমতা কারোর থাকে না।

শারীরিক অসুখ সমাজের চোখে পড়ে, কিন্তু মন? মনের অসুস্থতা আবার কী! এই প্রশ্নই মনের খাদটাকে করে আরও গভীর, আরও ভয়ানক। শরীর শুকিয়ে আসে, চোখের নিচে বলিরেখা, স্পষ্ট হয় ডার্ক সার্কেল।
মানুষ জিজ্ঞেস করে— “কি হয়েছে? অসুস্থ নাকি?”
ব্যাস, এখানেই শেষ সব।

জানেন তো? মনের অসুখ এই সমাজে “সুখে থাকতে ভুতে কিলানো অসুখ”! সভ্য সমাজ এই মানুষগুলোকে ডাকে “মেন্টাল” বলে, অথবা বলে “ওর মানসিক সমস্যা আছে।” ফলেই ভেঙে দেওয়া হয় মানুষটার দুর্বল মন—
বারবার, হাজারবার। হয়তো সেই কারণেই তারা হাসিমুখে চেপে রাখে মনের যন্ত্রণা।

এরপর শুরু হয় আরও ভয়ানক খেলা,
যখন অস্থিরতা চরমে পৌঁছে যায়।
মন ছটফট করে, আবেগ আর চিন্তাশক্তি ছুটে যায় দুদিকে। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ড যেন কয়েকশো গুণ দ্রুত ধুকপুক করতে শুরু করে— মনে হয়, যদি এটা বাইরে বেড়িয়ে আসে, তবে শান্তি মিলবে! তবু বাঁচার তাগিদ থাকে, কিন্তু পাশে থাকে না কেউ।
একাকিত্ব এমন ভয়ানক হয় যে, হাজার মানুষের ভিড়েও তাকে কেউ দেখতে পায় না। ভয় গ্রাস করে, আতঙ্ক চরমে পৌঁছায়। মুখে হাসি ধরে রাখা যায় না,
বুকের ধুকপুকানি থামাতে বুক চাপড়াতে হয়। জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে গিয়ে চোখ ফেটে জল এসে যায়,
গলা দিয়ে আওয়াজ বের হয় না—
প্রচণ্ড কষ্ট! সেই মুহূর্তগুলো অপরিচিত অধ্যায় নিয়ে আসে, আর দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে যায় মন, হৃদয়, মস্তিষ্ক।

আর তখনও কেউ নেই বলার মতো—“আমি আছি তোমার পাশে।” বরং যারা থাকে, তারাই পেছনে কথা বলে। তবু সেই মানুষগুলো বাঁচার প্রাণপণ চেষ্টা করে—
মারাত্মক চেষ্টা করে! হার মানতে চায় না।
কিন্তু সঠিক চিকিৎসা, সহানুভূতি আর সাহায্যের হাত না পেয়ে আরও গভীর খাদে তলিয়ে যায় তারা।

ছোটোবেলার না-বলা কথা, যেগুলো বাবা-মা একসময় সহজেই বুঝে নিতেন,তারা আজ কেন মুখোশ পরা হাসিটা বুঝতে পারেন না? কেন হাত বাড়িয়ে দেন না?
কেন সব কথা মুখে বলে বোঝাতে হবে? মনের অসুস্থতা বোঝে না কেন?হয়তো পূর্বের সেই আত্মিক টানটাই আলগা হয়ে যায়…তারপর— চিরতরে হারিয়ে যায় কেউ একজন।

এই রোগ শুধু যুব সমাজে নয়,
এর শিকড় ছড়িয়ে পড়েছে কিশোর থেকে প্রবীণ সকল মনে। সবসময় যে চাওয়া-পাওয়ার কারণেই বিষণ্ণতা আসে, তা নয়—দীর্ঘ দিনের অবহেলা, অপমান, খারাপ ব্যবহার— সবই দায়ী এই রোগের জন্য।

এই বিষণ্ণতা (ডিপ্রেশন) আর আতঙ্কবোধ (অ্যাংজাইটি) মারাত্মক রোগ। যারা এই রোগীর পাশে থেকেছেন, তারা জানেন—কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে এটি। তাদের সুস্থ করে তোলার দায়িত্ব আমাদের সবার— সমাজের, চিকিৎসকের, আত্মীয়ের, বন্ধুর, আর সর্বোপরি— বাবা-মায়ের।

একটাই জীবন। সেই জীবন খুব সুন্দর, যে অবস্থাতেই তৈরি হোক না কেন! তাকে আরও সুন্দর করে তোলাটাই আসল চ্যালেঞ্জ। মৃত্যু চরম সত্য, নিশ্চিত—
কিন্তু অনিশ্চিত জীবনকে চ্যালেঞ্জ নিয়ে এগিয়ে চলাটাই সত্যিকারের লড়াই। সমাজ মনের অসুখ নিয়ে শিক্ষিত হোক। আর যারা এই অন্ধকার থেকে ফিরে এসেছে, তারা এগিয়ে আসুক—অন্যের অসমাপ্ত কাজ সম্পূর্ণ করতে তার হাতটা ধরুক।

জীবন জিতুক।
ভরাট হোক মনের খাদ।
কারণ প্রতিটি ভোরই নতুন শুরু করার সুযোগ।

By nb24x7

দিনদুনিয়ার খাসখবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *