
রবি আড্ডায় শৌভিক রায়
পর্ব- ৮
দাহকার্যের পর পরলোকগত মানুষটির অস্থি বিসর্জন দেওয়ার রীতি রয়েছে আমাদের পরিবারে। সাধারণত গঙ্গা নদীতেই সেটি করা হয়ে থাকে। দিনহাটা থেকে গঙ্গার দূরত্ব প্রায় সাড়ে চারশো কিমি। বছর কয়েক আগে ঠাকুরদার চলে যাওয়ার পর, সেজকাকু গিয়েছিলেন ফারাক্কার গঙ্গায়। সঙ্গী ছিলাম আমি। বিকেলে নিউ কোচবিহার ট্রেনে চেপে ফারাক্কা নেমেছিলাম ভোরবেলায়। সকাল দশটার মধ্যে কাজ শেষে মালদায় এসে অনেকটা সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল রাতের ফিরতি ট্রেনের জন্য। মালদা বাস স্ট্যান্ডের কাছে দেড় টাকায় নিরামিষ ভাত খেয়ে, পুরো দুপুরটা কাটিয়ে ছিলাম মালদা রেল স্টেশনের বাইরে নতুন হওয়া রেলের পার্কে। সুদৃশ্য সেই পার্ক নির্মাণের পেছনে ছিলেন মালদার প্রখ্যাত মানুষ ও তদানীন্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গনি খান চৌধুরী। ঠাকুমার বেলাতেও সেজকাকুর ওপর দায়িত্ব পড়ল। কিন্তু এবার কাকুর সাথী অন্য কেউ।
কিছুদিন আগে দাদা দিনহাটায় চলে এসেছিল। স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে কেমিস্ট্রি অনার্স করে একটি কম্পিউটার ফার্মে কিছুদিন কাজ করছিল কলকাতায়। হঠাৎ কী হল কে জানে, সেটা ছেড়ে দিল। কম্পিউটার একটা অদ্ভুত যন্ত্র। এক লপ্তে নানা অঙ্ক করে দেয়। বিভিন্ন ধরণের গেম খেলা যায় টিভির মতো স্ক্রীনে। আরও বহু কাজ করা যায় নাকি। প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী কম্পিউটারের ওপর খুব জোর দিচ্ছেন। পেপারে প্রতিদিন লেখালিখি হচ্ছে। যদিও আমাদের রাজ্য সরকার এর বিরুদ্ধে। এতে নাকি চাকরির সুযোগ কমবে। এই চলছে। কিন্তু যেটা করছিল দাদা, সেটা কেন ছেড়ে দিল ও-ই জানে। নিজে ভাল ছাত্র ছিল বলে দিনহাটায় টিউশন পেতে দেরি হল না। পার্বতী ড্রেস হাউস, জোয়ারদার বাড়ি ইত্যাদিতে ওর ছাত্র জুটে গেল। কয়েকদিন পর বাবা জোর করেই পাঠিয়ে দিল বেলুড়ে বি এড পড়াতে। সেখানে কিছুদিন থাকতে না থাকতেই, দক্ষিণ-পূর্ব রেলের চাকরির চিঠি এসে হাজির। বুঝতে পারছিলাম সারা জীবনের নামে ওর দিনহাটা-ফালাকাটার পাট চুকলো।
কম্পিউটার আমাদের রাজ্যে প্রভাব ফেলবে কিনা সেটা নিয়ে দ্বন্দ্ব আছে। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে আমাদের রাজ্যে একই সরকার দেখে আসছি। আমরা বাঙালিরা যে স্থিতাবস্থা পছন্দ করি, সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারছি। ভর্তি হয়ে গেলাম হোমিওপ্যাথি ডাঃ সিদ্দিকের চেম্বারের পাশের টাইপ রাইটিং স্কুলে। উল্টোদিকেই, রাস্তার ওপারে, স্টেট ক-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক। ব্যাঙ্কের পেছনে আমার খুব ছোটবেলার দুই বন্ধু পিটু আর গৌতমদের বাড়ি। টাইপিং স্কুল চালান মিঠুদা। আমার প্রায় সব বন্ধুরা টাইপিং শিখে নিয়েছে। ফালাকাটায় সুদামদার টাইপিং স্কুল ছিল বিখ্যাত। দিনহাটায় মিঠুদার। এক মুখ দাড়ি মিঠুদা নানা বিষয়ে প্রচুর খবর রাখেন। আমার সঙ্গে খুব সখ্য হয়ে গেল। এক ঘন্টার ক্লাস শেষে, নানা গল্প করি। টাইপ রাইটারের খটাখট অবশ্য রাতের ঘুমেও বিভীষিকা মনে হয়। অবশ্যই স্বপ্নে। কেননা কোনও দিনই কোনও বিষয়ে স্কিল দেখাতে পারিনি। এটাও পারব না। জানি ভালভাবে।

আজকাল দিনহাটায় আর জি পার্টি তৈরি হয়েছে বিভিন্ন পাড়ায়। চোর-ডাকাতের উপদ্রব বেড়েছে। তাই রাত জেগে পাহারা দেওয়া হচ্ছে। রাত এগারো-সাড়ে এগারো থেকে মোটামুটি তিনটে-সাড়ে তিনটে অবধি পাহারা চলে। প্রত্যেকের হাতেই লম্বা চার ব্যাটারির টর্চ। অন্য হাতে লাঠি। পাড়ার সব বাড়ি থেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একজন করে নিয়ে টিম। ফলে সপ্তাহে এক বা দুই দিন পাহারা দিতে হচ্ছে। আমাদের বাড়ি থেকে আমি যাচ্ছি। কখনও মধু বা ভজন কিংবা বাবুন আসছে ওদের বাড়ি থেকে। পুরো গোধূলি বাজার চক্কর দেওয়া হচ্ছে। থানা পাড়ার আর জি পার্টির সঙ্গে দেখা হচ্ছে ঘুরতে ঘুরতে। গোধূলি বাজার কালী মন্দিরের পেছনে পুকুর আর মাঠ। ফাঁকা ফাঁকা। অন্যদিকে বাড়িগুলোর ফাঁকে ফাঁকে গাছগাছালি। ঝোপঝাড়। লুকিয়ে থাকা সহজ। বিশেষ করে রাতের অন্ধকারে। আমাদের আর জি পার্টির অন্যতম সদস্য হলেন পার্থদা। পার্থ সরকার। মুস্তাফি বাড়ির উল্টোদিকে বাড়ি। বাবার ছাত্র উনি। খুব ভাব হয়ে গেল আমার সঙ্গে। বয়সে অনেক বড় হলেও বন্ধুত্ব হয়ে গেল। প্রচুর পড়াশোনা। সমৃদ্ধ হচ্ছি ওঁর সঙ্গে থেকে।
গভীর রাতের গোধূলি বাজার অন্যরকম। বিকেলে যেখানে বাজার বসে, রাতে সেখানে সময় থমকে থাকে। বাঁশ আর বেড়ার অস্থায়ী ছাউনিগুলোতে ঝুপি ঝুপি অন্ধকার বিমূর্ত শিল্প তৈরি করে। কতিপয় যে দালান বাড়ি আছে, সেগুলিকে চাঁদের আলোয় প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর মতো মনে হয়। অবশ্য সেরকম বাড়ি আর কয়টা! ছোটবেলায় গীতপিসির বাড়িটিকে বিরাট মনে হত। ডাকবাংলো পাড়ায় তখন সেভাবে পাকা বাড়ি নেই। তার মধ্যে রাজকীয় ছিল ওই বাড়িটি। পুরুষবিহীন সেই বাড়িতে গীতাপিসি, বুড়িদি আর বেবিদিকে নিয়ে, থাকেন এখনও। বাড়ির একটা অংশ ভাড়া দেওয়া। সেখানে অত্যন্ত সুপুরুষ কৌশিকদা রয়েছেন। স্টেট ব্যাঙ্কে চাকরি করেন। কলকাতার দিক থেকে এসেছেন। বুড়িদির সঙ্গে বিয়ে ঠিক। বেবিদি আমার চাইতে কিছুটা বড়। কিন্তু একদম মা ঠাকুরণ। বকাঝকা সব আমাকেই। গীতাপিসির বাড়িতে আছেন শৈবালদাও। কবি হিসেবে ওঁর খ্যাতি বেশ। খুব ছোটবেলায় এই বাড়ির দেওয়ালে গাই-বাছুর চিহ্ণে ভোট দিনলেখাটি ছবি সহ দেখেছিলাম। সেটা এখনও মনে গেঁথে আছে। ওদের বাড়ির একপাশে খোকনকাকুর বাড়ি। হাতে স্ক্যাচ নিয়ে খোকনকাকু কোচবিহার যান প্রতিদিন চাকরি করতে। অন্যপাশে বিদুরদের বাড়ি। বিদুর আমার ছোটবেলার বন্ধু।
দিনহাটায় তো বটেই কোচবিহার শহরেও এখনও অধিকাংশ বাড়ি কাঠ আর টিনের। সিমেন্টের দালান বাড়ি নেই তা নয়। কিন্তু পরিমাণে কম। পুরো শহরে এক ধরণের সব বাড়ি। দোতালার ওপর বাড়ি চোখে পড়ে না। রাজনগরের নিয়ম। রাজপ্রাসাদের চাইতে উঁচু বাড়ি তৈরি হয় না। টিনের চালের বাড়িতে সবচেয়ে মজা বৃষ্টির দিনে। সারাদিন বৃষ্টির শব্দ। বিশেষ করে রাতের বেলায়। দুরন্ত লাগে। কাঠের দেওয়ালের ফাঁকফোঁকর দিয়ে হাওয়া ঢুকলেও, শান্তি অনেক। আর বৃষ্টি কি যে সে! একনাগাড়ে সাতদিন, দশদিন চলছে। হসপিটালের উল্টোদিকের মাঠ, থানা পাড়া, গোধূলি বাজার সব জায়গায় জল থৈ থৈ। পা ডুবিয়ে কলেজ যাচ্ছি। তার মজা আলাদা। বৃষ্টির পর চড়া রোদ। ভাদ্র মাস। কোচবিহারের রাস্তায় এগোলেই দুই পাশের জলা জমি থেকে পচা পাটের গন্ধ। কোথাও রোদে পাট শুকোতে দেওয়া।
এরকমই একদিন প্রচন্ড রোদে যখন চারদিক ঝিম ধরে আছে, হঠাৎ কানে এলো এক ব্যারিটোন গলা। এক দোকানে বাজছে, নীলা আশমা শো গ্যায়া..... গা কাঁটা দিয়ে উঠলো। মেরুদন্ড দিয়ে শিরশিরে ঠান্ডা নেমে এলো। অমিতাভ বচ্চন। বহুগুনার মতো পোড় খাওয়া দুঁদে রাজনীতিবিদকে হারিয়েছেন নির্বাচনে। কিন্তু বোফোর্স মামলায় ফেঁসে আছেন। দিনহাটার ভবানী আর মহামায়া সিনেমা হলে বচ্চনের ছবি এলেই দৌড়ে যাই। যদিও এর মধ্যে আমির খান আর জুহি চাওলার কেয়ামত সে কেয়ামত তক অনেককে পাগল করে দিয়েছে, কিন্তু বচ্চন তো বচ্চনই! তুলনা কোথায় তাঁর?
এরকমই একদিন, পাজামা পরে মহামায়া সিনেমা হলের সামনে গিয়েছিলাম। বাবুন ছিল সঙ্গে। দেখি রীনা দাঁড়িয়ে কয়েকজনকে নিয়ে। আমাকে পাজামা আর টি-শার্টে দেখে মুখের এমন এক্সপ্রেশন দিয়েছিল যে বলার নয়। আমি যে বাউন্ডুলে সেটা বোঝাচ্ছিল ওর চাউনি।
কিন্তু মনে তো আমার অমিতাভ। প্রকৃত বাজিগর। তখনও অবশ্য শব্দটার অর্থ জানি না।
(ক্রমশ)
পর্ব – ৭
https://www.facebook.com/share/p/169aFiTyjy/