রবি আড্ডায় শৌভিক রায়

পর্ব- ১৪

মৌলিক স্যার প্রথম দিনই একটা ব্যাপার স্পষ্ট করে বললেন,

  • তোমরা অনেক পরে শুরু করলে। হাতে মাত্র পাঁচ মাস। আমার আর একটা ব্যাচ অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে। ওদেরকে আমি থরোলি পড়াচ্ছি। তোমাদের ক্ষেত্রে যে সেরকমটা সম্ভব নয় নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ। তাই, তোমরা আমাকে বলবে, তোমাদের কী নোটস লাগবে। আমি সেটা দেব। পরদিন সেটা মুখস্ত করে আমার এখানে বসে লিখে দেখাতে হবে।

মাথায় হাত পড়ল আমার। মুখস্ত করতে পারি না। নোটসের গতানুগতিক পদ্ধতির পড়ায় একেবারেই অভ্যস্ত নই। পরিবর্ত কোনও উপায়ও নেই। এমনিতে আমাদের ডিসি স্যারের কাছে কোনও কিছু বুঝতে হলে, যে কোনও সময় সেটা পারব। ওঁর দরজা সবসময় খোলা। এসসি স্যারও ফিরে এসেছেন। তাঁর কাছেও যাওয়া যাবে। সেদিক থেকেও কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু নিয়মিত টিউশন আর বুঝে নেওয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে। তাছাড়া অনিলকাকু যেভাবে বই দিয়ে দিতেন, সেটা ওঁদের কাছে নাও পেতে পারি। তাই বিকল্প একটাই- মাটি কামড়ে পড়ে থাকা।

নির্দিষ্ট দিনগুলোতে পড়তে যাই। স্যার নোটস দেন। লিখি। উনি নোটস বুঝিয়ে দেন। বাড়ি ফিরে এসে সেটা পড়ি। মুখস্ত হয় না।

ফলে যেটা এতদিন করিনি, সেটাই করি। যেদিন নোটস লিখে দেখাতে হয়, সেদিন নকল করি। ইচ্ছে করে দুই একটা ভুল করি। যাতে স্যার বুঝতে না পারেন যে, নকল করেছি।

এভাবেই চলল। পার্ট ওয়ানে তিনটে পেপার ছিল। স্যার শুরু করলেন ফিফথ পেপার দিয়ে। এই পেপারে কবিতা। ফোর্থ পেপারে উপন্যাস। সেটা পরে হবে। প্রবন্ধ বিষয়টি নতুন না হলেও, গ্রিক নাটক ব্যাপারটা নতুন। তবে একেবারেই অন্য ব্যাপার ছিল সাত নম্বর পেপার। ফিলোলোজি।

স্যারের নোটস বোঝানোতে একটু লাভ হয়। দুই একটা প্রশ্ন করা যায়। কিছু জানা যায়। কিন্তু সেটা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো। শুভ বাদেও আমাদের ব্যাচে রয়েছে এবিএন শীল কলেজের মুকুল, তুফানগঞ্জ থেকে আসা অরিন্দম আর দিনহাটা কলেজের স্পেশাল অনার্সের গৌরাঙ্গ। তিনজনই অত্যন্ত নিরীহ ও ভদ্র। ওদের পাশে আমি আর শুভ একেবারেই বেমানান। আমরা প্রথম থেকেই বেপরোয়া। স্যারের বাড়িতে ঢোকার আগে সিগারেট। পড়া শেষে আবার। আর মাঝে মাঝেই ওরা চলে গেলে, অন্য কিছু। কখনও সাগরদিঘির পাশে, কখনও বাঁধের ওপরে।

কলেজে নতুন ব্যাচ এসেছে। জয়দীপ, সঞ্জীব, জহিররা ভর্তি হয়েছে। পুরোদমে ওদের ক্লাস চলছে। কিন্তু থার্ড ইয়ারের ক্লাসের কথা কেউ বলছে না। কয়েকদিন কলেজে ইতস্তত ঘুরে বুঝলাম, ক্লাস না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বুঝলাম যা করার নিজেরই করতে হবে। টিউশন ও কলেজের ভরসায় থাকলে চলবে না।

দাদা কলকাতায়। ওকে চিঠি লিখলাম কিছু বই কিনবার জন্য। ও সেগুলো কিনে পাঠাল। হাজির হলাম ফালাকাটা কলেজে। বাবি মাসি ওখানকার লাইব্রেরিয়ান। তাসাটি চা-বাগানে বাবি মাসির বাড়ি। ফালাকাটা কলেজে জয়েন করবার পর, বাবি মাসি প্রয়োজনে কোনও কোনও দিন আমাদের বাড়িতে রাতে থাকতেন। একটা সুন্দর সম্পর্ক ওঁর সঙ্গে। মাসির জামাইবাবু ডঃ বাজপেয়ী একসময় ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার ছিলেন। আমার বাবার সঙ্গে তাঁর বেশ হৃদ্যতা ছিল। ডঃ বাজপেয়ীর মেয়ে আছে একটি। নামটা সুন্দর। সাহানা।

বাবি মাসিকে সমস্যাটা বললাম। মাসি নিজের কার্ডে ফালাকাটা কলেজ থেকে কিছু বই ইস্যু করলেন। তাপসদাও লাইব্রেরির দায়িত্বে ছিলেন। উনিও দিলেন। ফালাকাটা কলেজে অনার্স না থাকলেও, ইংরেজির বেশ ভাল ভাল বই ছিল। আমার প্রয়োজন অনেকটাই মিটে গেল।

সপ্তাহে দুই দিন ফালাকাটা লাইব্রেরিতে নিজের মতো নোটস নিই। কিছু বই নিয়ে আসি। বাকি দিনগুলি কোচবিহার-দিনহাটা করে কেটে যায়।

জানুয়ারি মাসে অনিলকাকুর হঠাৎ ডাক,

  • কলেজে আয়। কথা আছে।
    গেলাম।
  • চল….একটা পিকনিক করি।
  • পিকনিক?
  • হ্যাঁ। আমরা কয়েকজন যাব। আর তোরা। মানে ছাত্রছাত্রীরা।

শুরু হল প্রস্তুতি। দেখা গেল, পিকনিকে যেতে অনেকেই রাজি। স্যারদের মধ্যে অনিলকাকু ছাড়াও ডিসি স্যার যাবেন। অন্য ডিপার্টমেন্ট থেকে শওকত আলি আর এক-দুজন যাবেন। গাড়ি ঠিক হল। শ্রীমা। সাধনদা ড্রাইভার। বৈরাগীদা গাড়ির ক্লিনার। ডেকোরেটার্সের জিনিস, রান্নার কাঠ সব কিনলাম। ডিসি স্যার দিনহাটা থেকে উঠবেন। অনিলকাকু আর আলিস্যারকে কোচবিহার থেকে তুলতে হবে। রীনা উঠবে দেওয়ানহাট থেকে। কিছু ছেলেমেয়ে কোচবিহার থেকে।

ছবি- আমি আর ভজন। দিনহাটার সুচিত্রা স্টুডিওতে তোলা। ভজন আর নেই। পরবর্তী জীবনে সফল ওষুধ ব্যবসায়ী ভজন দিনহাটা ফুলদিঘিতে সাঁতার কাটতে কাটতেই চলে যায় সবাইকে ছেড়ে।

সব হল। সকালের খাবার, দুপুরের রান্নার সবজি, মাংস ইত্যাদি সব রেডি। কিন্তু রাঁধুনি আর পাওয়া যায় না। সব দায়িত্ব আমার ওপর। মহা সমস্যায় পড়লাম। হঠাৎ মধু প্রস্তাব দিল, ও রান্না করে দেবে। শুধু ওকে বিনে পয়সায় নিয়ে যেতে হবে।

মধু রাঁধবে? ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না। মধু শুধু আত্মীয় নয়। বন্ধুও। কমার্স নিয়ে আমার এক ব্যাচ আগে পড়লেও, এতদিন ইকোনোমিক্স বুঝে নিয়েছে আমার কাছে। ওর বন্ধু রঘু, গাঠু, কানুরা আমারও বন্ধু। ওরা সবাই আমাকে ভালবাসে। এমনিতে সবাই ওদের যারা চোখে দেখলেও, আমি জানি যে কোনও সাহায্যে সবার আগে আমার পাশে ওরাই দাঁড়াবে। কিন্তু তাই বলে মধু? রাঁধুনি?

উপায়ও দেখছি না সামনে। এমনিতেই ভরা পিকনিকের সিজন। প্রতি রবিবার সকালে শোনা যায় রাম্বা হো হো...., হাওয়া হাওয়া এ হাওয়া...., এ আমার গুরুদক্ষিণা... বাজাতে বাজাতে পিকনিক পার্টি চলছে। কোথায় পাব রাঁধুনি? আর যদিও বা পাই, সে যে পয়সা চাইবে সেটা দেওয়া সম্ভব হবে না।

কিন্তু মধু পারবে তো? সবার সামনে বেইজ্জত হব না তো? টেনশন শুরু হয়ে গেল……

(ক্রমশ)

পর।ব – ১৩

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=pfbid08w8DyD846nK8eQDniKtTrkiF2vkZfxe9AqAbiHMYrEC5WkoMx83b4X1s6C6Qm3Shl&id=100087944172233&mibextid=Nif5oz

By nb24x7

দিনদুনিয়ার খাসখবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *