
রবি আড্ডায় স্বর্ণা দাস
জানি না আমার এ লেখা কত জন পড়বে? বা কত জনের কাছে পৌঁছাবে? তবুও লিখছি।
বাঙালি ( সংখ্যা গরিষ্ঠ) বারবরই হিন্দু, তাকে নতুন করে হিন্দু বা হিন্দুত্ববাদ শেখানো হচ্ছে কেনো? কথায় আছে বাঙালির বারোমাসে তেরো পার্বন। বৈশাখের প্রথম দিনের গনেশ পুজো থেকে চৈত্রে সংক্রান্তির চরক পুজো( গাজন) । এর মাঝে তো অগুনতি পুজো পার্বণ। তারপর তো মাসপ্রতি এক একটা ষষ্ঠী পূজা। কোন দিন তো বাঙালির এতো পুজো পার্বনে সমস্যা হয় নি।
বাংলায় জন্মেছেন গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু, ছয় গোস্বামী, জন্মেছেন রামকৃষ্ণ পরমহংস, বিবেকানন্দের মতো ধর্মপ্রাণ মানুষেরা। বাঙালি এদের ভক্তি করে শ্রদ্ধা করে। বাংলার ঘরে ঘরে কোনো বই না পড়া হোক কৃত্তিবাসী রামায়ণ আর কাশীদাসের মহাভারত তো পড়া হয়। মতুয়া বাঙালিদের অগ্রগতিতে এগিয়ে এসেছেন হরিচাঁদ ঠাকুর, এছাড়াও আরো অনেকে।
বাঙালির সাহিত্যের দিকে তাকালে বাংলাভাষার সাহিত্যে তো দেবতার ছড়াছড়ি। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বৈষ্ণবপদাবলি, মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, শিবমঙ্গল, পুরো মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য তো ধর্মকে নির্ভর করে। বাঙালি সেই যে শক্তিকে দেবতাকেও ঘরের মেয়ে করতে পারে, শিবকে জামাই করে ঠাট্টা করতেও তার বাঁধে না।
বাংলার গ্রামে গ্রামে কৃষ্ণলীলা, রামলীলা আজও মানুষকে কাঁদায়, বাঙালি বরাবরই ভক্তি প্রবণ, ধর্মপ্রাণ। সেই বাঙালিকে নতুন করে কেনো আবার হিন্দুত্বের পাঠ নিতে হবে? কেনো কোনো রাজনৈতিক দল বাঙালিকে শেখাবে আমাকে ক্ষমতা দাও আমি তোমাকে পুজো করতে দেবো? তবে কী আমরা এতো দিন পুজো করি নি? করি নি আরাধ্য দেবতার সাধনা?
এখন প্রশ্ন হলো শুধু কী আমার ধর্মাচারণের স্বাধীনতার জন্য ( কেউ কেউ বলেন) রাজাকে নির্বাচন করবো?
আমার যদি পকেটে টাকা না থাকে তবে কী করে ধর্ম করবো? দেবতার পুজো করতে গেলেও তার নানা উপাচারের দরকার, তার জন্য দরকার টাকা, কিন্তু আমার হাতে কাজ নাই, আমি রেশনের চাল খাই, লকডাউনে অন্যের দয়াতে আমাকে বাঁচতে হয়েছে। বিশ্বাস করুণ আমার ঘরের দেবতাকে আমি একদানা চিনি বাতাসাও দিতে পারি নি।
আমি (সে যে কেউ হতে পারে) পড়াশোনা করেছি , আশা চাকরি করবো, পরিবারকে ভালো রাখবো। আমার কাজ নেই, আমি অভুক্ত, সাথে আমার বাবা, মা, আর ঘরের দেবতাও অভুক্ত। আমি বারোমাসের একটা পার্বনও করতে পারি না।
এবার একদল প্রশ্ন করবে ঈশ্বরের উপাসনা করতে গেলে মনের দরকার কোনো উপাচারের না, এটা দর্শনের কথা, যদি আপনারা তাই বলেন তবে এতো মন্দির কেনো করছেন?
অযোধ্যায় রাম মন্দির হয়েছে, দিঘাতে জগন্নাথ মন্দির, ভালো কথা হোক, আমি আমার পরিবারকে নিয়ে সেখানে যেতে চাই, তারজন্য কী দরকার ভক্তি, না টাকা, আর সেটার জন্য কাজ চাই। আমার হাতে কাজও নাই আমার ভক্তিও নাই। ধর্ম পালনের একটা অঙ্গ হিসাবে তীর্থযাত্রাকে মনে করা হয়। তারজন্যও চাই টাকা, সেটাও আমার নেই কারণ আমাকে কেউ চাকরি দেই নি, আমাকে কেউ কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয় নি। প্রশ্ন হতে পারে কেনো আমি স্বনির্ভর হচ্ছিনা? বিশ্বাস করুণ উচ্চশিক্ষা নিতে গিয়ে যে পরিমান টাকা লেগেছে তা থাকলে ব্যাবসা করতে পারতাম, কিন্তু তা তো হয় নি। এখন আমার উপায় কী?
বাঙালিকে হিন্দুত্ববাদ শেখাতে আসা কী সোনার পাথরবাটি না? যে বাঙালির রন্ধ্রে রন্ধ্রে গৌরাঙ্গের প্রেম ভাবনা আছে, যে বাঙালি রামকৃষ্ণের যত মত তত পথ এর বিশ্বাসী, যে বাঙালি বিবেকানন্দেে মতো সবাইকে আমার প্রিয় ভাই বোন বলে কাছে টানতে পারে তাকে সত্যিই হিন্দুত্ববাদ শেখানো যাবে?
আমি জন্মগত সূত্রে হিন্দু পরিবারের, আমি পাড়ার বারোয়ারী দুর্গা পুজো, কীর্তন সবেতেই থাকি, সরস্বতী পুজোর আগে এখনো কুল খেলে মন খটখট করে। তাই প্লিজ আমাকে বলবেন না যে যদি একমাত্র ভোটে জিতে আমি রাজা হই, তবে তুমি নিশ্চিন্তে ধর্ম পালন করতে পারবেন।
বরং যদি আপনারা আমাকে আমার যোগ্যতা অনুসারে কাজ দেন তো আমি বাবা, মা কে নিয়ে গঙ্গা সাগর বা পুরী বা কেদারনাথ বদ্রিনাথ ঘুরে আসতে পারি, এতে কতটা কী পূণ্য হবে (যদি হয়) জানি না তবে প্রকৃতির নানারূপ দর্শণ হবে।
একটা কথা ভুললে হবে না, এ বাংলা মহেশের বাংলা, যাকে বাঁচাতে গফুর মরিয়া হয়ে উঠেছিল, গ্রামের হিন্দু জমিদার না।
মন্দির, মসজিদ না করে আমাকে কাজ দিন। না হলে একদিন সত্যই আমরা মানচিত্র ছিঁড়ে খাবো …..
আমাকে কাজ দিলে আমার ধর্ম রক্ষা পাবে, না তো আমার সাথে সাথে আমার দেবতাও অনাহারে মরবে।