মঙ্গল শোভাযাত্রার ইতিকথা

// শর্মিষ্ঠা কুন্ডু//

নতুন বছরের ভোরটা যেন অন্য সব দিনের চেয়ে একটু আলাদা। আকাশটা একই থাকে, রোদটাও একইভাবে ওঠে, তবু মানুষের চোখে-মুখে এক অদ্ভুত উচ্ছ্বাস খেলা করে। সেই উচ্ছ্বাসই যেন ছড়িয়ে পড়ে রাস্তাঘাটে, মানুষের পোশাকে, গানে, আর সবচেয়ে বেশি করে—মঙ্গল শোভাযাত্রায়।
কিন্তু এই শোভাযাত্রারও তো একটা গল্প আছে—একটা শুরু, একটা ইতিহাস, একরাশ মানুষের স্বপ্ন আর প্রতিবাদের মিশেলে গড়ে ওঠা এক অনন্য ঐতিহ্য।


গল্পটা শুরু হয় বহু বছর আগে। তখনও নতুন বছর মানে ছিল পঞ্জিকার পাতায় একটা তারিখ বদল। মানুষ উৎসব করত ঠিকই, কিন্তু সেই উৎসব ছিল অনেকটাই ব্যক্তিগত—ঘরের ভেতরে, পরিবারে সীমাবদ্ধ।
ঢাকার এক তরুণ শিল্পী—নাম তার আরিফ। চারুকলার ছাত্র। সে ভাবত, “নতুন বছর যদি সত্যিই নতুন হয়, তবে সেটা শুধু নিজের ঘরের মধ্যে কেন থাকবে? কেন না সবাই মিলে রাস্তায় নেমে একসাথে নতুনকে স্বাগত জানানো যায়?”
আরিফের এই ভাবনা প্রথমে খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। বন্ধুরা কেউ কেউ হেসে বলত,—“এত কষ্ট করে রাস্তায় মিছিল করার কি দরকার? পান্তা-ইলিশ খেয়ে ঘরে বসে থাকলেই তো হয়!”
কিন্তু আরিফ থামেনি। তার মনে হয়েছিল, নতুন বছর মানে শুধু খাওয়া-দাওয়া নয়—এটা একটা মানসিক মুক্তি, অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে একসাথে দাঁড়ানোর দিন।


একদিন আরিফ তার কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে বসলো। তাদের মধ্যে ছিল মেহজাবিন, রুদ্র, শাওন—সবাই শিল্পপ্রেমী, সৃষ্টিশীল মানুষ।
আরিফ বলল,—“চল আমরা একটা শোভাযাত্রা করি। কিন্তু সেটা হবে অন্যরকম। সেখানে থাকবে মুখোশ, রঙিন প্রতীক, বড় বড় শিল্পকর্ম—যা দেখলেই মানুষ বুঝবে আমরা অশুভের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি।”
মেহজাবিন একটু ভেবে বলল,—“মানে, একধরনের প্রতিবাদও হবে?”
—“হ্যাঁ,” আরিফ মাথা নাড়ল, “প্রতিবাদ, আবার উদযাপনও। একটা মঙ্গলময় ভবিষ্যতের ডাক।”
এই ভাবনা থেকেই জন্ম নিল এক নতুন পরিকল্পনা—“মঙ্গল শোভাযাত্রা”।


প্রথম বছরটা ছিল খুবই সাধারণ। কয়েকটা বড় মুখোশ, কিছু রঙিন পাখি, বাঘ, ঘোড়ার প্রতীক—এসব নিয়েই তারা বের হয়েছিল রাস্তায়।
মানুষ প্রথমে অবাক হয়ে দেখছিল। কেউ কেউ হাসছিল, কেউ আবার মোবাইল তুলে ছবি তুলছিল।কিন্তু ধীরে ধীরে সেই শোভাযাত্রার ভেতরে একটা শক্তি তৈরি হতে লাগল—একটা সম্মিলিত চেতনা।
এক বৃদ্ধা পথের ধারে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন,—“বাবা, তোমাদের এই আয়োজনটা খুব ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে যেন সব অশুভ দূরে সরে যাবে।”
আরিফ তখন বুঝেছিল, তারা সঠিক পথেই এগোচ্ছে।


পরের বছর শোভাযাত্রা একটু বড় হলো। আরও মানুষ যোগ দিল। শুধু চারুকলার ছাত্ররা নয়, সাধারণ মানুষও এগিয়ে এল।
কেউ বানাল বিশাল এক পেঁচা—জ্ঞান আর সতর্কতার প্রতীক।কেউ বানাল সূর্য—আলো আর নতুন শুরুর প্রতীক।কেউ আবার বানাল দানবের মুখোশ—অশুভ শক্তিকে চিহ্নিত করার জন্য।
শোভাযাত্রা ধীরে ধীরে রূপ নিল এক সাংস্কৃতিক আন্দোলনে।
রুদ্র বলল,—“দেখেছিস, আমরা শুধু একটা অনুষ্ঠান করিনি, একটা ভাবনা ছড়িয়ে দিয়েছি।”
মেহজাবিন হেসে বলল,—“এই ভাবনাটাই একদিন ইতিহাস হবে।”


সময়ের সাথে সাথে মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়ে উঠল নতুন বছরের অবিচ্ছেদ্য অংশ।প্রতিবছর পয়লা বৈশাখে মানুষ অপেক্ষা করে এই শোভাযাত্রার জন্য।
শিশুরা নতুন জামা পরে আসে, হাতে ছোট ছোট মুখোশ।যুবক-যুবতীরা রঙিন পোশাকে নাচে-গানে মেতে ওঠে।বয়স্করাও পিছিয়ে থাকে না—তাদের চোখে থাকে গর্ব, আনন্দ আর আশার আলো।
এই শোভাযাত্রার একটা বিশেষ দিক ছিল—এটা কখনো শুধু আনন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।যখনই সমাজে অন্যায় বেড়েছে, যখনই মানুষ কষ্ট পেয়েছে—শোভাযাত্রার প্রতীকগুলো সেই কথাই বলেছে।
কখনো দেখা গেছে বড় বড় মুখোশে দুর্নীতির চিত্র,কখনো দেখা গেছে শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ,আবার কখনো শুধু শান্তির বার্তা।


এক বছর দেশে বড় একটা সংকট দেখা দিল। চারদিকে হতাশা, মানুষের মুখে হাসি নেই।অনেকে বলল,—“এবার শোভাযাত্রা না করাই ভালো।”
কিন্তু আরিফ, তখন আর শুধু একজন মানুষ নয়—একটা ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সে বলল,—“এই সময়েই তো আমাদের শোভাযাত্রা দরকার। যখন অন্ধকার বেশি, তখনই তো আলো দেখাতে হয়।”
সেই বছর শোভাযাত্রায় সবচেয়ে বড় প্রতীক ছিল এক বিশাল সূর্য—যেন অন্ধকার ভেদ করে উঠে আসছে।
মানুষ সেই দৃশ্য দেখে কেঁদেছিল, আবার হাসিও পেয়েছিল।কারণ তারা বুঝেছিল—আশা এখনও বেঁচে আছে।


ক্রমে এই শোভাযাত্রা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বে পরিচিত হয়ে উঠল।অনেক বিদেশি পর্যটকও এই সময় আসে, এই অনন্য উৎসব দেখার জন্য।
তারা অবাক হয়ে দেখে—কিভাবে একটা সাধারণ শোভাযাত্রা মানুষের হৃদয়ে এত গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
একজন বিদেশি বলেছিল,—“This is not just a festival, this is a voice of people.”
আরিফ তখন মুচকি হেসে বলেছিল,—“Yes, it’s the voice of hope.”


বছর কেটে যায়। আরিফ বুড়িয়ে যায়।কিন্তু তার স্বপ্নটা বেঁচে থাকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে।
একদিন তার নাতনি—ছোট্ট মেয়ে তিথি—তাকে জিজ্ঞেস করল,—“দাদু, এই মঙ্গল শোভাযাত্রা কেন হয়?”
আরিফ একটু হেসে বলল,—“কারণ আমরা চাই, নতুন বছরটা যেন ভালো হয়। আমরা চাই, সব খারাপ জিনিস দূরে চলে যাক।”
তিথি আবার জিজ্ঞেস করল,—“তাহলে আমরা কি সত্যিই সব খারাপ দূর করতে পারি?”
আরিফ তার মাথায় হাত রেখে বলল,—“যদি আমরা সবাই একসাথে চাই, তাহলে পারি।”


পরের বছর তিথি প্রথমবারের মতো শোভাযাত্রায় অংশ নেয়।তার হাতে ছিল একটা ছোট্ট সূর্যের মুখোশ।
সে যখন ভিড়ের মধ্যে হাঁটছিল, তখন হঠাৎ তার মনে হলো—সে একা নয়।তার চারপাশে হাজার হাজার মানুষ, সবাই একই উদ্দেশ্যে এগিয়ে চলছে।
সেই মুহূর্তে তিথি বুঝতে পারল—মঙ্গল শোভাযাত্রা শুধু একটা অনুষ্ঠান নয়, এটা একটা অনুভূতি, একটা শক্তি।

১০
আজও যখন পয়লা বৈশাখ আসে,রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে সেই রঙিন শোভাযাত্রা।
বড় বড় মুখোশ, রঙিন পাখি, বাঘ, সূর্য—সব মিলিয়ে এক অপূর্ব দৃশ্য।মানুষ গান গায়, নাচে, হাসে—আর মনে মনে প্রার্থনা করে—
“নতুন বছরটা যেন মঙ্গলময় হয়।”
এই শোভাযাত্রার ইতিকথা তাই শুধু অতীতের গল্প নয়—এটা বর্তমানের প্রেরণা, ভবিষ্যতের আশা।
কারণ যতদিন মানুষ স্বপ্ন দেখতে জানে,ততদিন মঙ্গল শোভাযাত্রা চলবে—অশুভকে দূরে সরিয়ে,আলোর পথে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা নিয়ে।

শেষ কথা
মঙ্গল শোভাযাত্রা আমাদের শেখায়—উৎসব মানে শুধু আনন্দ নয়,উৎসব মানে একসাথে দাঁড়ানো,অশুভের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ,আর এক সুন্দর, মঙ্গলময় ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা।
নতুন বছরের প্রতিটি ভোরে তাই এই শোভাযাত্রা যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—“অন্ধকার যতই গভীর হোক,আলো আসবেই।”

শর্মিষ্ঠা কুন্ডু
নিউ উকিলপাড়া
রায়গঞ্জ, উত্তর দিনাজপুর

By nb24x7

দিনদুনিয়ার খাসখবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *