রবি আড্ডায় শৌভিক রায়

পর্ব – ১৭

পথচলতি মানুষেরা তাকিয়ে দেখছে। পাঁচটি ছেলে মদনমোহন মন্দিরের বাগানে, রাজবাড়ির মাঠে, সাগরদিঘির ধারে গোল হয়ে বসে কী যেন করছে! কেউ বলছে এটা ডিসিলাবিক, কেউ আবার চিৎকার করছে পেন্টামিটার…..

চলছে আমাদের পড়াশোনা। ফিলোলোজি পেপারের। ওই পেপারে দীর্ঘ এসে রাইটিং ছাড়াও প্রেসি রাইটিং আছে। এসে আর প্রেসির ব্যাপারে কিছু করবার নেই। নিজেকেই করতে হবে। সাহায্য করার ব্যাপার কিছু নেই। কিন্তু ফিলোলোজি বোঝানো যায়। আপাতত আমরা সেটাই করছি। নিজেরাই নিজেদেরকে পড়াচ্ছি।

তবে ব্যাপারটা বেশিদিন চলল না। কেননা কয়েকদিনের মধ্যেই মৌলিক স্যার আমাদের ব্যাচ বন্ধ করে দিলেন। রীনার কাছে জানলাম আমাদের ওপর খুব রেগে আছেন। ওদের ব্যাচে সেটা বুঝিয়েছেন,

  • তোদের জন্য আমাদেরও সমস্যা হয়েছে।
  • কেন?
  • স্যার ভাবছেন আমরাও তোদের মতো করতে পারি।
  • দেখ, আমাদের উপায় ছিল না কিছু। তিনমাস পর শুরু করেছি। আর স্যার নিজেই বলেছিলেন, আমাদের যা দরকার সেটা বলতে হবে, তার বাইরে স্যার আলাদা কিছু করাবেন না। সেটাই বলেছি…
  • সবসময় সব কিছু বলতে হয় না। কী লাভ হল?

সত্যিই কোনও লাভ হল না। নিজেদের পড়াও সেভাবে এগোলো না। শুধু শুধু কে আর কোচবিহারে আসবে এটুকুর জন্য? মুকুল সরে গেল সবার আগে। অরিন্দম তুফানগঞ্জ থেকে আসে। সুতরাং ওর পক্ষেও সম্ভব হল না। গৌরাঙ্গের বাড়ি দিনহাটা ছাড়িয়ে প্রান্তিক এলাকায়, সীমান্তের দিকে। রইলাম শুধু আমি আর শুভ। শাটল ককের মতো সেই ছোট থেকে দিনহাটা-ফালাকাটা করছি। ফলে আমার অসুবিধে নেই। শুভদের পুরোনো পোস্ট অফিস পাড়ার প্রিয় কুটির নামের বাড়িটি আমারও প্রিয় হয়ে গেল। মাঝেমাঝেই আসি। দুজনে পড়ি। ভাতও খেয়ে নিই কখনও। দেদার ধোঁয়া ওড়ে। কখনও বাইরে গিয়ে আরও কিছু জোটে। শুভর দিদি বনবাণীদি কখনও টের পায়। দুজনকেই বকে। দিদি ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে। মাঝে মাঝে আসে।

থার্ড ইয়ারে কলেজে একটা ক্লাসও হল না। নির্দিষ্ট কোনও কারণ নেই। আজ হয়ত এই স্যার নেই। কাল আর একজন। অনিলকাকু তো এমনিতেই এম ফিলের জন্য ছুটিতে। মাঝে মাঝে ডিসি স্যারের কাছে যাই। এটা ওটা বুঝে নিই। অধিকাংশ সময় ফালাকাটায় থাকি। তবে রীনার সঙ্গে যোগাযোগ আছে। পোস্টকার্ডে ওকে চিঠি লিখি। এক-দুদিন পরেই পেয়ে যায়। ওর উত্তর পাই। ওরা যে খুব সিরিয়াসলি পড়ছে সেটা বুঝতে পারি। কখনও দিনহাটায় আসবার পথে ওদের বাড়ির দিকে তাকাই। ইচ্ছে করে নেমে পড়তে। নিজেকে আটকে রাখি। ওরা কী ভাববে সেটা ভেবে।

দেখতে দেখতে পরীক্ষা চলে এলো। কলেজের উত্তরদিকের দোতলা বিল্ডিংয়ের ঘরে সিট পড়ল। মাঝে একদিনের গ্যাপ দিয়ে প্রত্যেকটা পেপার। পার্ট ওয়ানের সেই নড়বড়ে অবস্থা আর নেই। সব উবে গেছে। যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস নিয়ে লিখে চলি। এক্সট্রা পাতা নিই। সব্যসাচী স্যার গার্ড দিতে এসে মজা করে বলেন, ইউনিভার্সিটিকে কত পয়সা দিয়েছ ফর্ম ফিলাপের সময় যে এত কাগজ নিচ্ছো! স্যারের কথা শুনে হেসে ফেলি। পিঠ চাপড়ে দেন স্যার। ডিসি আসেন। চোখ দুটো গোল গোল করে বলেন, লেখো লেখো।

একটার পর একটা পেপার হয়। ফিলোলোজি পেপারে এসে মন খুলে চল্লিশ মার্কসের এসে লিখলাম। আমার এতদিনের যাবতীয় জানা আক্ষরিক অর্থেই ঢেলে দিলাম লেখায়। প্রেসি রাইটিংয়ের জন্য আলাদা করে তৈরি করেছিলাম নিজেকে। ভাল লিখলাম সেটাও। ফিলোলোজি অবশ্য বুঝতে পারলাম না যে, ঠিক হল নাকি ভুল! কিন্তু সব মিলে মনে হল ঠিকই আছে। তবে সবচেয়ে ভাল লিখলাম পোয়েট্রি পেপার। অন্যগুলোও ঠিকঠাক মনে হল। অনার্স পাব না, সেই ভাবনা আর নেই। কিন্তু যে পার্সেন্টেজ পেয়েছি সেটা ধরে রাখতে পারব কিনা, সে চিন্তা মাথায় ঘুরতে লাগল।

আট নম্বর পেপার দিয়ে কলেজ থেকে বেরিয়ে এলাম। কলেজের উল্টোদিকে এসডি স্যারের বাড়ি। কোচবিহারের বাস দাঁড়ায় ওখানে। প্যাসেঞ্জার তোলে। রীনা দাঁড়িয়ে আছে। বাস ধরবে বলে।

  • কেমন হল পরীক্ষা?
  • ভালই। তোর?
  • মোটামুটি।
  • ভালই হবে। ভাল নম্বর পাবি।
  • তোরা তো অনেক আগে পড়তে শুরু করেছিলি। তোদের ভাল হবে। আমাদের তো মাঝপথেই….
  • ভাল হবে। ভাল করে পড় এরপরেও। একটা জায়গায় তো আসতে হবে।
  • মানে?
  • মানে বুঝতে হবে না…..

বাস এসে গেল। রীনা উঠে গেল বাসে। কী বলল কিছুই বুঝলাম না। পিকনিকের দিন জানতে চেয়েছিলাম, আমাদের বন্ধুত্ব এরকমই থাকবে কিনা। এটা কি তার উত্তর? ও কি কিছু বলে গেল? কিন্তু কী বলল? কেনই বা বলল?

উত্তর হাতড়াতে লাগলাম নিজের মনেই…..

(ক্রমশ)

পর্ব -১৭

https://www.facebook.com/share/p/17yQyKJhY8/

By nb24x7

দিনদুনিয়ার খাসখবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *